বিশ্বকাপের মঞ্চে যখনই আর্জেন্টিনা মাঠে নামে, বুয়েনস আইরেসের চেয়ে কোনো অংশে কম কম্পন তৈরি হয় না হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে।
দূর পরবাসের এই অকৃত্রিম, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবার ছুঁয়ে গেছে খোদ আর্জেন্টিনার ডাগআউটকে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের মহারণে নামার আগে বাংলাদেশের কোটি সমর্থকদের উদ্দেশে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা উঠতেই স্কালোনির কণ্ঠে ঝরে পড়ে মুগ্ধতা। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, বাংলাদেশ সবসময়ই তাদের চমকে দেয়।
দূর দেশের এই উন্মাদনা আলবিসেলেস্তে শিবিরকে কতটা অনুপ্রাণিত করে, তা লুকাতে চাননি এই ট্যাকটিশিয়ান।
সেমিফাইনালে জয় এনে বাংলাদেশের সমর্থকদের মুখে চওড়া হাসি ফোটানোর আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
কষ্টের পথ পেরিয়ে শেষ চারে আর্জেন্টিনা এবারের বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই আর্জেন্টিনাকে লড়তে হয়েছে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত।
চারপাশের সমালোচনাকে এক পাশে ঠেলে পরিসংখ্যানের আয়নায় দলকে দেখছেন স্কালোনি। টানা আরেকবার বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নেয়ায় শিষ্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই পর্যায়ে উঠতে হলে নিশ্চয়ই আমরা ভালো কিছু করেছি।
আমি এই ছেলেদের কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ ওরাই আবার আমাদের বিশ্বের সেরা চার দলের মধ্যে নিয়ে এসেছে। আমরা অনেক ভালো কাজ করেছি। কখনও কখনও তা যথেষ্ট মনে হয় না, কিন্তু এখান পর্যন্ত যা করেছি, তা নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত।”
বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ মঞ্চে কোনো কিছুই যে সহজে ধরা দেয় না, সেটিও মনে করিয়ে দেন কাতার বিশ্বকাপজয়ী এই কোচ। তাঁর মতে, কষ্ট ছাড়া সাফল্য পাওয়া অসম্ভব, “সেমিফাইনাল বা ফাইনালে উঠতে হলে ভুগতেই হয়, যদি না প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে থাকেন।
আগের বিশ্বকাপেও আমরা অনেক ম্যাচে প্রতিপক্ষের চেয়ে ভালো খেলেও ভুগেছি। বিশ্বকাপে প্রতিকূলতা সামলে এগিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
সামনে ইংল্যান্ড, কেইন-বেলিংহ্যামকে রুখতে বিশেষ ছক ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড।
কোয়ার্টার ফাইনালে কঠিন পরীক্ষা দিয়ে আসা থ্রি লায়ন্সদের নিয়ে বেশ সতর্ক আলবিসেলেস্তেরা।
বিশেষ করে ইংলিশ দুই চালিকাশক্তি হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যামকে নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন স্কালোনি।
প্রতিপক্ষের দুই মহাতারকার প্রশংসা করে স্কালোনি বলেন, “এটি আগের ম্যাচের চেয়ে ভিন্ন একটি লড়াই হবে। আমরা যে জায়গাগুলোতে ভালো করতে পারিনি, সেগুলো নিয়ে কাজ করেছি।
কেইন ও বেলিংহ্যাম এমন দুই ফুটবলার, যাদের যে কোনো কোচই দলে চাইবেন। তবে তাদের থামাতে আমাদেরও নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে।”
ফকল্যান্ড বিতর্ক উধাও স্কালোনির সৌজন্যে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল ম্যাচ মানেই ফুটবল রোমান্টিকদের মনে উঁকি দেয় ঐতিহাসিক ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’।
সংবাদ সম্মেলনেও অবধারিতভাবে উঠে এসেছিল সেই প্রসঙ্গ। তবে মাঠের যুদ্ধকে ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সঙ্গে মেলাতে তীব্র আপত্তি জানান স্কালোনি।
অত্যন্ত মার্জিত ও পরিপক্ব ভাষায় তিনি ফুটবলকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানান।
ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই স্কালোনির সোজাসাপ্টা বক্তব্য, “এটা শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ। ৪০ বছর আগে যা ঘটেছে, তা বদলানোর ক্ষমতা আমাদের নেই।
ইতিহাসকে আমরা অবশ্যই স্মরণ করি, কিন্তু ফুটবলকে যুদ্ধের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা ঠিক নয়। যারা সেই সময়ে কষ্ট পেয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি; এটি বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনাল, এর বেশি কিছু নয়।”
ইতিহাসের আবেগ আর বর্তমানের রণকৌশল-সব মিলিয়ে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই জমে উঠেছে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের এই ক্ল্যাসিক দ্বৈরথ।
এখন দেখার বিষয়, স্কালোনির ছক ভেঙে থমাস টুখেলের শিষ্যরা ফাইনালে যায়, নাকি আরও একবার বাংলাদেশের ভক্তদের হাসিয়ে বিশ্বজয়ের মঞ্চে পা রাখে আর্জেন্টিনা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

