সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও নাড়িয়ে দিয়েছে লাখো মানুষের বিবেক।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে থাকা মাত্র ৩ মাস বয়সী এক নিষ্পাপ শিশুর পা ধরে নির্মমভাবে মোচড় দেওয়া হচ্ছে।
নরসিংদীর মাধবদী থানার পাইকারদি এলাকায় ঘটে যাওয়া এই নির্মমতার শিকার শিশুটির নাম ‘রিজিক’।
পারিবারিক বিরোধের জেরে নিজের আপন জাঁ-এর (জা) সন্তানের ওপর এই নিষ্ঠুরতা চালিয়েছেন চাচি লতা বেগম।
এই ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হলেও অদ্ভুত কারণে নীরব ছিল শিশুটির পরিবার।
অবশেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই অভিযুক্তকে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নরসিংদী সদর উপজেলার আমদিয়া ইউনিয়নের পাইকাদি এলাকার জহিরুল মিয়া ও সাময়া আক্তার দম্পতির একমাত্র সন্তান রিজিক।
জন্মের পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতার কারণে শিশুটিকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হয়েছিল।
অসুস্থ সন্তানের পাশে মা সাময়া আক্তারকে হাসপাতালে থাকতে হওয়ায় বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম একা করতে হতো জহিরুলের বড় ভাই কাউসার মিয়ার স্ত্রী লতা বেগমকে।
সংসারের বাড়তি কাজের এই চাপ থেকেই জাঁ সাময়া আক্তারের ওপর মনে ক্ষোভ পুষে রাখেন লতা বেগম।
এই মনমালিন্যের জের ধরে গত ১১ জুন এক নির্মম কাণ্ড ঘটান লতা। ঘরে কেউ না থাকার সুযোগে তিনি ৩ মাসের শিশু রিজিকের পা টেনে ধরে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন এবং নির্মমভাবে মোচড় দেন। ঘরে থাকা সায়মা আক্তারের মোবাইল ফোনে পুরো ঘটনাটি রেকর্ড হয়ে যায়।
সম্প্রতি সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে।
টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) মাধবদী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির খোঁজখবর নেয়।
তবে পুলিশের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শিশুটির বাবা জহিরুল মিয়া ও মা সাময়া আক্তার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সবাইকে হতবাক করেছে।
তারা দাবি করেন, ভিডিওটি আসলে ‘এডিটেড’ (সম্পাদিত)।
শিশুটির মা সায়মা আক্তার ও বাবা জহিরুল মিয়া বলেন, “আমাদের সন্তানের কোনো পা ভাঙেনি। আপনারা নিজের চোখে এসে দেখেন, তার পায়ে কোনো ব্যান্ডেজ বা প্লাস্টার নেই।
পারিবারিক বিষয় নিয়ে জাঁ-এর সঙ্গে একটু ঝামেলা হয়েছিল, সেই জেরে ও বাচ্চার পা মোচড় দিয়েছিল।
পরে ওর বাবা আমাদের বাড়িতে এসে ক্ষমা চেয়েছেন, বকাঝকা করেছেন। আমরা বিষয়টি পারিবারিকভাবেই মীমাংসা করে ফেলেছি।”
পরিবার সমঝোতা করলেও আইনের হাত থেকে রেহাই পাননি অভিযুক্তরা। সমাজসেবামূলক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে এসেছে প্রশাসন।
গত মঙ্গলবার রাতে সমাজসেবা অফিসের প্রবেশন অফিসার লিজা আক্তার বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে মাধবদী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন-শিশুটির চাচি লতা বেগম, চাচা কাউসার মিয়া এবং নানা শ্বশুর আলমাস মিয়া।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে আজ বুধবার (১৫ জুলাই) মাধবদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানান, “ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি।
যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করা হয়েছে, তবে সমাজসেবা অফিসের প্রবেশন অফিসার লিজা আক্তার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন।
এই মামলায় ইতিমধ্যে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত চাচি লতা বেগম বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, তাকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।”
পারিবারিক সম্মানের দোহাই দিয়ে যে অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করছিল খোদ শিশুটির মা-বাবা, প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে তা আলোর মুখ দেখল।
এলাকাবাসী এই আইনি পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং পলাতক আসামির দ্রুত শাস্তি দাবি করেছেন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


