গত দেড় দশকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রযুক্তিবান্ধব যতগুলো ডিজিটাল ফাইল খোলা হয়েছে, তার প্রত্যেকটির শেষ পরিণতি ঘটেছে একটি অন্ধকার নথিকক্ষে।
কখনো গাড়ির জ্বালানি তেল চুরি রোধ, কখনো হোল্ডিং ট্যাক্স আত্মসাৎ বন্ধ, আবার কখনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়া ঠেকাতে একের পর এক জমকালো প্রকল্প ও অ্যাপ চালু করেছে সংস্থাটি।
তবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পর এর একটিও টিকিয়ে রাখা যায়নি। ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধনের পর প্রযুক্তির এই অকালমৃত্যু চসিকের সক্ষমতার অভাব নাকি এর পেছনে কাজ করছে কোনো শক্তিশালী অদৃশ্য সিন্ডিকেট-তা নিয়ে এখন খোদ নগরবাসীর মনেই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুরনো প্রযুক্তির সেই ব্যর্থতার কঙ্কাল চেপে রেখেই আজ (শনিবার) চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আরও একটি নতুন অ্যাপের উদ্বোধন করেছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ নামের এই অ্যাপটি উদ্বোধনের আগেই জন্ম দিয়েছে তীব্র বিতর্কের।
কারণ, যে অ্যাপ পরিচালনার জন্য নূন্যতম কারিগরি জনবল ও সক্ষমতা চসিকের নেই, তা কতদিন সচল থাকবে তা নিয়ে খোদ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই চলছে কানাঘুষা।
৩ কোটির নতুন অ্যাপ: জনবলহীন আরেক বিলাসিতা?
তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ভেনটো টেক’ কর্তৃক নির্মিত এবং ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের অর্থায়নে তৈরি এই অ্যাপে রাস্তাঘাট, মশার উপদ্রব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, অবৈধ স্থাপনা ও জলাবদ্ধতাসহ ১০টি ক্যাটাগরিতে সরাসরি ছবিসহ অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
রয়েছে ‘সমাধান কাউন্টারে’ লাইভ পরিসংখ্যান ও জরুরি হটলাইন সুবিধা। কাগজে-কলমে এই উদ্যোগ আকর্ষণীয় মনে হলেও অন্তরালের বাস্তবতা ভিন্ন।
চুক্তি অনুযায়ী, এই সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বছরে ৮৩ লাখ টাকা দিতে হবে, যা চার বছরে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকায়।
কিন্তু চসিকের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, পূর্বের বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করার পুরনো অভ্যাসের কারণে উদ্বোধনের আগেই এই অনলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ফলে বরাবরের মতোই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর এই অ্যাপটিও স্রেফ উদ্বোধনী উল্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা প্রবল।
অটোমেশনের শুভংকরের ফাঁকি ও ডেটাবিহীন চুক্তি
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চসিকের ডিজিটাল উদ্যোগগুলো আসলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার চেয়ে হুটহাট চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
গত ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হোল্ডিং ট্যাক্স সংগ্রহের জন্য একটি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করে চসিক।
এর মাত্র কয়েক মাস পর, ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি বি-ট্র্যাক সলিউশনস লিমিটেড এবং মাইলেজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক হোল্ডিং ট্যাক্স ডিজিটালাইজেশনের জন্য আরেকটি চুক্তি করা হয়।
সবচেয়ে বড় কৌতুককর বিষয় হলো, চসিকে সরকারি ও বেসরকারি-এই দুই ধরনের হোল্ডিংয়ের অস্তিত্ব থাকলেও, কোনগুলো ‘বাণিজ্যিক হোল্ডিং’ তা আজ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে জরিপ করে চিহ্নিতই করা যায়নি।
ফলে যে ব্যবস্থার কোনো ডেটাবেজই নেই, তা অটোমেশনের চুক্তি করা কেবলই শুভংকরের ফাঁকি।
এর আগে ২০১২ সালে তৎকালীন মেয়র মনজুর আলমের আমলে ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি হোল্ডিং ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং পরবর্তীতে আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলের উদ্যোগগুলোও ফাইলবন্দি হয়ে ধূলিসাৎ হয়েছে।
যেখানেই সংস্কার, সেখানেই সিন্ডিকেটের থাবা
চসিকের ডিজিটাল ব্যর্থতার খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেখানেই দুর্নীতি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের থাবায় প্রযুক্তি অচল হয়ে গেছে।
তেল চুরি রোধে ভিটিএস (২০১৫): চসিকের গাড়ির তেল চুরি ঠেকাতে সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম’ (ভিটিএস) চালু করা হয়েছিল।
কিন্তু তেল চোর সিন্ডিকেটের অদৃশ্য প্রভাবে মাত্র ওয়ান-টাইম ব্যবহারের পর ৬ মাসের মাথায় এটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ট্র্যাকিং: বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়া রোধে ৬০০ কর্মীকে বিশেষ সিম দেওয়া হয়েছিল।
মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কাজে গতি এলেও, রহস্যজনক কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই এই প্রযুক্তির কবর দেওয়া হয়।
কলসেন্টার ১৬১০৪ (২০১৭): ২০১৭ সালে চালু হওয়া নাগরিক অভিযোগের এই কলসেন্টারটি দ্রুতই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
কিন্তু কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ২০২০ সালের শুরুতে এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নাগরিক সেবা অ্যাপ (২০২০): ২০২০ সালের ৩১ জুলাই চালু হওয়া চসিকের নাগরিক সেবা অ্যাপটি মাত্র দুই বছরের মাথায় উধাও হয়ে যায়। কারণ? ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিল পরিশোধ করেনি সিটি করপোরেশন।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চসিকের এই ডিজিটাল ব্যর্থতাগুলো মোটেও কাকতালীয় নয়। প্রতিটি অ্যাপ বা সিস্টেম উদ্বোধনের সময় কোটি কোটি টাকার বাজেট পাস হয়, ডেভেলপারের বিল পরিশোধ করা হয়, কিন্তু তা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয় না।
অনেক ক্ষেত্রে চোর ও দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থেই এই ট্র্যাকিং বা অটোমেশন সিস্টেমগুলো অচল করে দেয়, আর চসিক কর্তৃপক্ষও তাদের সামনে রহস্যজনক নীরবতা পালন করে।
চট্টগ্রাম নগরবাসী সেবা চান, করের টাকার অপচয় নয়। অতীতের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি ও ব্যর্থতার নেপথ্যে থাকা অদৃশ্য সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
অন্যথায়, ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপটিও যে চসিকের ব্যর্থতার ডিজিটাল তালিকায় আরেকটি নতুন সংখ্যা মাত্র হবে-তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


