চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসে সেবাপ্রাপ্তি যেখানে নিয়ম ও শৃঙ্খলার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকার কথা, সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্ষমতার দাপটে রীতিমতো একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম।
তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং বিভিন্ন আমদানিকারকের গোপন যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকি এবং নিষিদ্ধ পণ্য খালাসের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স সেলের (সিআইসি) অনুসন্ধানে।
কাস্টমস মহলে এই প্রভাব এতটাই গভীর যে, খোদ কমিশনারের কক্ষের প্রটোকল থেকে শুরু করে নীতিমালার তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি এখন প্রকাশ্য আলোচনার বিষয়।বিশ্লেষণে এগুলো আসলে একটিমাত্র সাম্রাজ্যের চারপাশের পাহারাদার খুঁটি-যে সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম।
টুকটুকির আড়ালে কোটি টাকার গৌরী ক্রিম ও প্রসাধনী
রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘কাফ করপোরেশন’ যখন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সবচেয়ে প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এর মাধ্যমে পণ্য খালাসের বন্দোবস্ত করে, তখন কাগজে-কলমে তার বিবরণ ছিল অত্যন্ত সাদামাটা।
বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-১০৯৮৭৬৬-তে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, সাধারণ টুথপিক, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার এবং কারখানার সাধারণ স্টেইনলেস স্টিল সার্কেলের।
কিন্তু এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি যখন দীর্ঘ কৌতূহল ও নানা নাটকীয়তার পর চালনটির কায়িক পরীক্ষা চালায়, তখন চোখ কপালে ওঠার দশা হয় কর্মকর্তাদের।
নথিতে সাড়ে ২২ টন সাধারণ টুথপিকের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র দেড় টন। আর বাকি সাড়ে ১৫ টনে বোঝাই ছিল বিএসটিআই ও আমদানি নিষিদ্ধ পাকিস্তানের কুখ্যাত গৌরী বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, প্রিমিয়াম সানগ্লাস এবং ঘোষণাবহির্ভূত যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রে।
শুধু এই একটি চালানই নয়, ‘এইচ আর এন্টারপ্রাইজ’ বা ‘নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স’ এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইঞ্জিন রাবার বুশের আড়ালে দামি মোটরপার্টস কিংবা হিট ট্রান্সফার পেপারের আড়ালে ফ্লেক্স ব্যানার আমদানির নামে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির এক সুচারু জাল বিছানো হয়েছিল।
এরমধ্যে এইচ আর এন্টারপ্রাইজের চালানে ইঞ্জিন রাবার বুশের ঘোষণা দিয়ে প্রায় ১৩ টন ওজনের আসল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটরপার্টস খালাসের চেষ্টা।
এবং নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স এর চালানেও চীন থেকে ২৩ টন হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দিয়ে প্রায় ২১.৫ টন ফ্লেক্স ব্যানার খালাসের অপচেষ্টা চালানো হয়।
সিআইসির লক ভেঙে সিল জালিয়াতি
কোনো চালানে সন্দেহ হলেই শুল্ক গোয়েন্দারা তাতে ‘লক’ বা বন্ধন দিয়ে সিলগালা করেন-এটিই কাস্টমসের প্রচলিত নিয়ম। কাফ করপোরেশনের ওই সন্দেহজনক কন্টেইনারেও লক দিয়েছিল সিআইসি।
কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য যা করা হলো, তা রীতিমতো অপরাধ জগতের চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি সাইফুলের লোকজন কনটেইনারের মূল সিল কেটে নিজেদের মতো করে ভুয়া সিল লাগিয়ে দেয়। এই সিল জালিয়াতির কারণে সিআইসিকে দীর্ঘ তিন মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে সশরীরে কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য।
অথচ, সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, কাস্টম কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারেই নতুন লক লাগানো হয়েছে। কিন্তু গোয়েন্দাদের তদন্তে এই সিল পরিবর্তনের পেছনে গভীর জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বেরিয়ে আসে, যা বন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সাইফুলের ইশারায় পার পায় নিষিদ্ধ পণ্যের চালান!
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এস এম সাইফুলের প্রভাব এতটাই প্রশ্নবিদ্ধ যে, তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো চালানে লক দেওয়ার মতো সাহস বা সৎসাহস দেখাতে পারেন না অনেক কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী এই নেতার পণ্য চালানে লক দেওয়ার জেরে সিআইসির তৎকালীন মহাপরিচালক আবদুর রকিবকে পর্যন্ত পদ থেকে সরে যেতে হয়েছিল (যদিও এনবিআর এটি দাপ্তরিক প্রক্রিয়া বলে দাবি করেছে)।
এর বাইরেও আরও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার নজির রয়েছে। হাউসের ওপেন সিক্রেট তথ্য অনুযায়ী, সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি কমিশনারের কক্ষে প্রবেশ করলে কমিশনারের দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি চালু রয়েছে।
এমনকি বন্ধের দিনে কাস্টম হাউসে প্রবেশ করে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইল সই করার ছবি বা তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের সাহস দেখাননি কেউ।
এস এম সাইফুল আলম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদকে পরিণত করেছেন এক অলঙ্ঘনীয় ক্ষমতায়।
আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফের এই মায়াজালে সাধারণ শুল্ক কর্মকর্তারা এতটাই কোণঠাসা যে, চোখের সামনে অনিয়ম দেখলেও তারা যেন অন্ধ সেজে থাকতে বাধ্য হন।তথ্যসূত্র: কালবেলা
সাইফুলকে রুখবে-কাস্টমসে কার এত ক্ষমতা?
কাস্টমসের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ও প্রশাসনিক পদে বসে আছেন কমিশনার মোহা. মাহবুবুর রহমান। অথচ হাউসের ওপেন সিক্রেট গুঞ্জন বলে, সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি সাইফুল যখন কমিশনারের রুমে প্রবেশ করেন, তখন খোদ কমিশনার দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান বা প্রটোকল জানান।
এই দৃশ্য দেখার পর অধিনস্থ কোনো কর্মকর্তার পক্ষে কী আর সাইফুলের কোনো চালানে প্রশ্ন তোলার নৈতিক সাহস থাকতে পারে?
সাহস এখানেই সীমাবদ্ধ না। বন্ধের দিনে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ঢুকে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইল সই করার মতো অবিশ্বাস্য কাণ্ডও ঘটিয়েছেন সাইফুল।
যদিও এই বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে, তবুও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেই চিত্র পুরো প্রশাসনকে নাড়া দিয়েছে।
এ বিষয়ে কাস্টম কমিশনারের বক্তব্য নিতে একাধিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।


