আমজাদের বার্তা/খরচের টাকা বেশি করে নিয়েন-কোর্টে যাতায়াত করতে হবে!

শিপ ব্রেকার্স নির্বাচনে ঋণখেলাপি আমজাদ আতঙ্ক-নির্বাচন বোর্ড চেয়ারম্যানকে হুমকি

প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬ ২১:০৯

চট্টগ্রামের শিপ ব্রেকিং শিল্পের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সামনে আসছে বিতর্ক, প্রভাব বিস্তার এবং আতঙ্কের নতুন নতুন অভিযোগ।

সর্বশেষ ঋণখেলাপির দায়ে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন চৌধুরীর একটি বার্তা ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন কি সত্যিই প্রভাবমুক্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারছে?

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একটি বার্তা পাঠান আমজাদ চৌধুরী।

সেখানে তিনি লেখেন, ‘যাদের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন শিডিউল দিয়েছেন, তাদের থেকে খরচের টাকা বেশি করে নিয়ে নিয়েন। কারণ আপনাকে নির্বাচনের পরে কোর্টে যাতায়াত করতে হবে। তখন তারা আপনার পাশে থাকবে না।’

বার্তাটিকে অনেকেই সরাসরি চাপ প্রয়োগের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। যদিও আমজাদ চৌধুরী দাবি করেছেন, তিনি কাউকে হুমকি দেননি, কেবল আইনি পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

তবে নির্বাচন ঘিরে অতীতের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক প্রায় প্রতিটি সংকটের কেন্দ্রে ঘুরেফিরে এসেছে একই নাম-আমজাদ হোসেন চৌধুরী।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল সংগঠনটির নির্বাচন। সে সময় ১১টি পদের বিপরীতে ১১ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন।

কিন্তু নির্বাচন বোর্ড অভিযোগ তোলে, আমজাদ চৌধুরীর ‘অযাচিত হস্তক্ষেপে’ তারা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পুরো নির্বাচন বোর্ড একযোগে পদত্যাগ করে। ফলে নির্বাচনই ভেস্তে যায়।

নির্বাচন না হওয়ার সেই সংকট কাটতে না কাটতেই গত বছরের ৩ নভেম্বর সংগঠনের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে সভাপতির পদ ‘দখল’ করার অভিযোগ ওঠে আমজাদের বিরুদ্ধে।

পরে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে অপসারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে প্রশাসক নিয়োগ করে সরকার।

কিন্তু অপসারণের পরও থামেনি বিতর্ক:
চলতি নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন আমজাদ চৌধুরী। তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৩০ এপ্রিল নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে।

পরে আপিল বোর্ডেও তিনি স্বস্তি পাননি। ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাঁর আপিল খারিজ করা হয়।এরপর শুরু হয় আদালতপাড়া কেন্দ্রিক লড়াই।

হাইকোর্টে রিট করে তিনি সাময়িকভাবে প্রার্থিতা ফিরে পেলেও শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে নির্বাচন বোর্ডের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

এর ফলে সভাপতি পদে তাঁর প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে যায়।

আপিল বিভাগের সেই সিদ্ধান্তের পরই নির্বাচন বোর্ড আগামী ১৩ জুন ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করে। আর সেই ঘোষণার পরপরই নির্বাচন বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে যায় বিতর্কিত বার্তাটি।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, আইনি অধিকার প্রয়োগ এবং আদালতে যাওয়ার বিষয়টি এক জিনিস, কিন্তু নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে এমন বার্তা পাঠানো অন্য বার্তা বহন করে।

বিশেষ করে যখন অতীতে নির্বাচন বোর্ডের পদত্যাগ, নির্বাচন স্থগিত এবং প্রশাসক নিয়োগের মতো ঘটনাগুলোর সঙ্গেও একই ব্যক্তির নাম জড়িয়ে রয়েছে।

নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তিনি স্বীকার করেছেন যে, আমজাদ চৌধুরী তাঁকে ওই বার্তা পাঠিয়েছেন।

সংগঠনটির একাধিক সদস্যের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে চলা টানাপোড়েন, আদালতকেন্দ্রিক লড়াই এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের কারণে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে অস্বস্তি এখনো কাটেনি।

তাঁদের মতে, ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা।

বর্তমানে সংগঠনটির ৮৬ জন ভোটার রয়েছেন। মোট ১৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। দুই বছর মেয়াদের জন্য সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, দুই সহসভাপতি ও সাতজন নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবেন।

তবে ভোটের ফলাফল যাই হোক, নির্বাচন শুরুর আগেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন এখন শুধু নেতৃত্ব বাছাইয়ের লড়াই নয়, এটি প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ঘিরে এক বহুমাত্রিক সংঘাতের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

আর সেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো রয়েছেন আমজাদ হোসেন চৌধুরী।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি