এনসিটি–সিসিটি ইজারা পরিকল্পনা: কার স্বার্থে বদলাচ্ছে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ?

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬ ১৭:১১
রাজীব সেন প্রিন্স: বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ বোঝার জন্য কখনো কখনো একটি মানচিত্রই যথেষ্ট। সেই মানচিত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়—দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় পুরো ভার বহন করছে একটি বন্দর।

আমদানিকৃত শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, ওষুধ কিংবা রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প—সবকিছুর প্রবেশ ও প্রস্থানের প্রধান দরজা এই বন্দর।

ফলে এর পরিচালনা নিয়ে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে শিল্পাঞ্চল, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

এমন বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কন্টেইনার টার্মিনাল—নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)—দেশি বা বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সম্ভাবনা নতুন করে জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা না এলেও, বিষয়টি ঘিরে প্রশাসনিক তৎপরতা, নথিপত্রের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে আলোচনাটি আর কেবল গুঞ্জনের পর্যায়ে নেই।

রোববার (২৮ জুন) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম দাবি করেছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় এনসিটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড–এর কাছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সংগঠনটির ভাষ্য, এই উদ্যোগ শুধু একটি টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং কৌশলগত নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত।

কীভাবে সামনে এল ইজারা পরিকল্পনা:

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দেশনা জারি হয়। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে ২১ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের স্বাক্ষরে একটি অফিস আদেশে নেগোসিয়েশন কমিটিকে সহায়তা করার জন্য ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাপোর্ট টিম গঠন করা হয়।

বন্দর রক্ষা কমিটির মতে, প্রশাসনিক এই প্রস্তুতি ইঙ্গিত দেয় যে আলোচনার প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। তবে একই সময়ের আরেকটি ঘটনা তাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, চলতি মাসেই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একই দিনে জারি করা দুটি পৃথক চিঠিতে ভিন্নধর্মী নির্দেশনা দেওয়া হয়। একটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা অথবা বাতিল করার কথা বলা হলেও অন্যটিতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা ছিল। এই দুই নির্দেশনার মধ্যে অসঙ্গতি সরকারের অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

সরকারি পর্যায় থেকে অবশ্য এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এনসিটি ও সিসিটি:

চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি ও সিসিটি সবচেয়ে বেশি কন্টেইনার পরিচালনাকারী অবকাঠামোর অন্যতম।

দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং রপ্তানিপণ্যের একটি বড় অংশ এই দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।

বন্দর রক্ষা কমিটির বক্তব্য, যে অবকাঠামো জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে, তার নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনার ধরনে যেকোনো পরিবর্তনের আগে বিস্তৃত জনআলোচনা, অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সংসদীয় পর্যায়ের স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।

সংগঠনটির দাবি, এই প্রক্রিয়ায় সেই স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।

দেশীয় অর্থে নির্মিত অবকাঠামো :

সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা কমিটি উল্লেখ করে, চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) সম্পূর্ণ বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত।

বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে এই টার্মিনালের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। একই সরকারের আমলে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে সংগঠনটির প্রশ্ন, জনগণের অর্থে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত অবকাঠামোর জন্য নতুন করে বিদেশি অপারেটরের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?

তাদের মতে, যদি কোনো টার্মিনাল অকার্যকর হতো, পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকত অথবা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হতো, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা যৌক্তিক হতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সে রকম নয় বলেই দাবি তাদের।

পরিসংখ্যান কী বলছে :

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এনসিটির নকশাগত বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ টিইইউস (TEUs)। কিন্তু বর্তমানে সেখানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডল করা হচ্ছে।

শুধু বার্ষিক নয়, মাসিক কার্যক্রমেও নতুন রেকর্ডের কথা উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে একক মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডল হয়েছে, যা টার্মিনালটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

সংগঠনটির মতে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে বিদ্যমান ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনশীলতা কমেনি; বরং অবকাঠামোগত সীমার মধ্যেও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা সম্ভব হয়েছে।

তবে বন্দর ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি টার্মিনালের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে শুধু কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ নয়, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম, ডিজিটাল অবকাঠামো, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা এবং পরিচালন ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বিতর্কের কেন্দ্রে ডিপি ওয়ার্ল্ড :

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর অপারেটর হিসেবে পরিচিত ডিপি ওয়ার্ল্ড বহু দেশে সমুদ্রবন্দর, কন্টেইনার টার্মিনাল এবং লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।

বন্দর রক্ষা কমিটির দাবি, এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ, পরিচালনার মেয়াদ, রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো কিংবা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বজায় থাকবে—এসব বিষয়ে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এই নীরবতাই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে যদি বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে তার উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সুফল এবং ঝুঁকির বিশদ ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এনসিটি ও সিসিটি ঘিরে বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—বিদেশি অপারেটরের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব গেলে দেশের অর্থনীতি কতটা লাভবান হবে, আর রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে।

এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনো সরকারিভাবে পাওয়া যায়নি। তবে সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা কমিটি একাধিক অর্থনৈতিক উদ্বেগ তুলে ধরে বলেছে, বিদ্যমান পরিচালন কাঠামো পরিবর্তনের আগে জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

চার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কেন বিতর্কিত :

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির অন্যতম অভিযোগ, চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হওয়ার আগেই ২০২৫ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

তাদের মতে, বন্দরের সেবা ব্যয়ের এমন বৃদ্ধি শুধু আমদানিকারক বা রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

কারখানার কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সেই ব্যয় পরে পণ্যের দামে যুক্ত হয়। একইভাবে রপ্তানিকারকদের লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে ওঠে।

প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দর লাভজনকভাবে পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও এই হারে চার্জ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করা হয়নি।

তার অভিযোগ, সম্ভাব্য ইজারাগ্রহীতার জন্য অধিক মুনাফার পরিবেশ তৈরি করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

অবশ্য সরকার এখনো এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি।

একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব কত দূর যায় :

বন্দর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই বলেন, সমুদ্রবন্দর কেবল জাহাজ ভেড়ানোর জায়গা নয়; এটি পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্র।

একটি কন্টেইনার বন্দরে প্রবেশ করার পর যে ব্যয় তৈরি হয়, সেটি পরিবহন, গুদামজাতকরণ, উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে যুক্ত হতে থাকে। ফলে বন্দরের ব্যয় বাড়া মানে শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হওয়া।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর শিল্প অর্থনীতিতে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট। কারণ শিল্পকারখানার বড় অংশের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আসে। বন্দরে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সময় এবং ব্যয়—দুটিই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেবামূল্য বৃদ্ধি বা পরিচালনগত অদক্ষতা রপ্তানি সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রশ্ন কোথায় :

বন্দর রক্ষা কমিটির মতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনা থেকে যে আয় হয়, তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয়।

তাদের আশঙ্কা, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব গেলে পরিচালন মুনাফার একটি অংশ লভ্যাংশ হিসেবে দেশের বাইরে চলে যাবে।

সংগঠনটির ভাষ্য, এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং রাষ্ট্র সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল। অনেক দেশেই বিদেশি অপারেটর পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগ এনে বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে মোট আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফলে প্রশ্নটি কেবল মুনাফা বিদেশে যাবে কি না—এতটা সরল নয়। বরং মূল বিষয় হলো, চুক্তির আর্থিক কাঠামো কী হবে, বিনিয়োগ কতটা নিশ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে।

বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি না বাস্তব অভিজ্ঞতা :

বিদেশি অপারেটরের পক্ষে সাধারণত একটি যুক্তি দেওয়া হয়—তারা উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। কিন্তু বন্দর রক্ষা কমিটি এই যুক্তির সঙ্গে একমত নয়।

সংগঠনটির দাবি, ২০২৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল–এর কাছে হস্তান্তরের পর বড় ধরনের নতুন অবকাঠামোগত বিনিয়োগ দৃশ্যমান হয়নি।

তাদের ভাষ্য, সম্প্রতি কয়েকটি গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, সেগুলো পরিচালন কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয় দিয়েই কেনা হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে সংগঠনটির প্রশ্ন—বিদেশি অপারেটর এলেই যে বিপুল নতুন মূলধন আসবে, সেই ধারণার বাস্তব ভিত্তি কতটা শক্তিশালী?

অবশ্য এ বিষয়ে রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।

নিরাপত্তা নাকি ব্যবসা—কোনটি অগ্রাধিকার :

অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

বন্দর রক্ষা কমিটির বক্তব্য, চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি, বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি, যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামসহ একাধিক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এসব অবকাঠামো কেপিআই-১ (Key Point Installation-1) হিসেবে স্বীকৃত।

তাদের দাবি, এমন সংবেদনশীল এলাকায় পরিচালন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে শুধু বাণিজ্যিক লাভ-লোকসানের হিসাব যথেষ্ট নয়; নিরাপত্তা মূল্যায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

সরকারি পর্যায় থেকে অবশ্য এ বিষয়ে কোনো নিরাপত্তা মূল্যায়নের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

জনগণের সামনে কী আসা উচিত :

বন্দর রক্ষা কমিটির মতে, এনসিটি ও সিসিটি নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে সম্ভাব্য চুক্তির মূল কাঠামো, বিনিয়োগের অঙ্ক, পরিচালনার মেয়াদ, রাজস্ব বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

তাদের যুক্তি, জাতীয় অর্থনীতির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত গোপনীয়তার মধ্যে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়।

স্বচ্ছতার এই দাবিই এখন পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি ঘিরে চলমান আলোচনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু আর কেবল পরিচালন পদ্ধতি নয়। প্রশ্ন উঠছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দর্শন নিয়ে। রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর ব্যবস্থাপনায় নতুন অংশীদার খুঁজছে, নাকি এমন একটি কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো জনসমক্ষে পরিষ্কার নয়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বন্দর রক্ষা কমিটি বর্তমান উদ্যোগকে অতীতের কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে।

অপ্রকাশিত নথির ছায়া

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, বন্দর-সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও টার্মিনাল এবং লালদিয়া চর–সংক্রান্ত সমঝোতাগুলোর শর্ত, আর্থিক কাঠামো, দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো বন্দোবস্তের আলোচনা শুরু হলে স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি হয় বলে মনে করে সংগঠনটি।

তাদের যুক্তি, জাতীয় সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার সংস্কৃতি যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, জনমনে সংশয়ও তত গভীর হবে।

কৌশলগত ভূগোলের বাস্তবতা :

বিশ্বের বড় বড় সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে অর্থনীতি যেমন গড়ে ওঠে, তেমনি গড়ে ওঠে নিরাপত্তা কাঠামোও। চট্টগ্রাম বন্দরও তার ব্যতিক্রম নয়।

বন্দর এলাকার আশপাশে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক, জ্বালানি ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বন্দর রক্ষা কমিটির মতে, এই বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে কেবল বাণিজ্যিক যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা অসম্পূর্ণ মূল্যায়ন হবে।

সংগঠনটির ভাষ্য, কেপিআই-১ মর্যাদাপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলোর নিকটবর্তী অবকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা-সংবেদনশীলতা, তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত ঝুঁকির বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

তবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন কী, তা জনসমক্ষে জানা যায়নি।

পুরোনো বিতর্কের নতুন প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের বন্দর খাতে বিদেশি অপারেটরের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।

সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতেও নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগের কথা আলোচনায় এসেছিল। সে সময় শ্রমিক সংগঠন, পেশাজীবী মহল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের বিরোধিতার মুখে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

তাদের মতে, সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নগুলো একই রয়ে গেছে—রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কোথায় থাকবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে এবং জনগণ কীভাবে এর সুফল পাবে।

রাজনীতির ভেতরের প্রত্যাশা :

সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতারা দাবি করেন, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার অন্যতম মৌলিক অবস্থান ছিল অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।

তাদের ভাষ্য, সেই রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে বর্তমান উদ্যোগের সামঞ্জস্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

যদিও সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান ব্যাখ্যা করেনি, তবু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিষয়টি যে আলোচনা সৃষ্টি করেছে, তা স্পষ্ট।

পাঁচ দফায় তাদের অবস্থান :

বিতর্কের সমাধান হিসেবে বন্দর রক্ষা কমিটি পাঁচটি দাবিকে সামনে এনেছে। তারা চায়—

  • এনসিটি ও সিসিটি ইজারার সব ধরনের উদ্যোগ বাতিল করা হোক।
  • বন্দর পরিচালনায় সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বজায় থাকুক।
  • অতীত ও বর্তমান সব বন্দর-সংশ্লিষ্ট চুক্তি প্রকাশ করা হোক।
  • জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো গোপন সমঝোতা না করা হোক।
  • ভবিষ্যৎ নীতির বিষয়ে সরকার স্পষ্ট ঘোষণা দিক।

এসব দাবির সমর্থনে আগামী ১ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্বরে সমাবেশ ও মানববন্ধনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

পুরো বিতর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে আসলে তিনটি স্তরের প্রশ্ন একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রশ্ন। বিদেশি অপারেটর যুক্ত হলে বন্দর কি আরও দক্ষ হবে, নাকি বিদ্যমান আয় ও নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে?

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক প্রশ্ন। এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কতটুকু তথ্য জনগণের সামনে আনা হয়েছে এবং কতটুকু আনা উচিত?

তৃতীয়ত, কৌশলগত প্রশ্ন। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারের ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র কোন সীমা পর্যন্ত অংশীদারত্ব গ্রহণ করবে?

এই তিন প্রশ্নের একটিও এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।

ফলে এনসিটি ও সিসিটি নিয়ে আলোচনা কেবল একটি চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং বাংলাদেশ আগামী দশকগুলোতে তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় কোন নীতি অনুসরণ করবে, সেই বৃহত্তর দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সরকারের। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে কতটা তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, কতটা স্বচ্ছতা এবং কতটা জনআস্থার ভিত্তিতে তা নেওয়া হচ্ছে—সেই প্রশ্নের উত্তরের ওপর।

কারণ দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার নিয়ে বিতর্কে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটিই—জাতীয় স্বার্থের সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে, এবং কীভাবে।এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দর

রোববার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এয়াজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম এবং বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি