অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরই বোয়ালখালী থেকে সরলেন বিতর্কিত ওসি মাহফুজুর

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরই প্রশাসনিক পদক্ষেপ, নতুন ওসি মোজাফফর

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬ ১৪:১৪

একটি থানা—যেখানে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে আদালতে না পাঠিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ, ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অনাস্থার কথা উঠে আসে দুটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে। আর সেই অনুসন্ধান প্রকাশের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বদলে যায় দৃশ্যপট।

গত ১৫ জুন দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন-এ “বোয়ালখালী থানার ভেতরে কী চলছে, ওসিকে নিয়েই যত বিতর্ক!” এবং সুপ্রভাত চট্টগ্রাম অনলাইন-এ “বোয়ালখালী থানায় আইনের শাসন নাকি ওসির ‘খেয়ালখুশি’? জনআস্থার চরম সংকটে পুলিশ বাহিনী” শিরোনামে প্রকাশিত দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

প্রতিবেদন দুটিতে বোয়ালখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজুর রহমান ও এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লাসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

সংবাদ প্রকাশের পরপরই জেলা পুলিশ অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা শুরু করে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

জনরোষ ও প্রশাসনিক তদন্তের মুখে শেষ পর্যন্ত (ওসি) মো. মাহফুজুর রহমান ও এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লাকে শাস্তিমূলকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সূত্রের দাবি, অভিযোগের বিষয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হলেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া এবং প্রকাশিত অনুসন্ধানের সূত্র ধরে অভ্যন্তরীণ তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় বিতর্কিত ওসি মাহফুজুর রহমানকে শাস্তিমূলকভাবে দূরবর্তী রাজশাহী রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। একই সাথে এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লাকেও বোয়ালখালী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সবশেষ তথ্যমতে, গত ২৮ জুন বোয়ালখালী থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন। এদিন বিকেলে থানা কার্যালয়ে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে তিনি বিদায়ী ওসি মাহফুজুর রহমানের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন ওসি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং জনগণের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সেবামুখী পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

উপস্থিত ছিলেন থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই জুয়েল রানা, এসআই ফারুখ, এসআই আজম খানসহ অন্যান্য সদস্য।

তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওসি বদলি ও নতুন নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়নি।

বিষয়টি নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

যে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় :
প্রকাশিত অনুসন্ধানে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল সিআর মামলা ১৪৬/২৩-এর ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি মো. মুজিবকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে না পাঠিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশে ১১ জুন এসআই মৃন্ময় অভিযান চালিয়ে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন। এ অভিযানে যাওয়ার আগে বাদীপক্ষের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।

কিন্তু গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই আসামিকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

তাদের আরও দাবি, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ওসি মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ওয়ারেন্টের মূল কপি না পাওয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে আইনজীবীদের মতে, ওয়ারেন্টে কোনো জটিলতা থাকলেও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থাপন করাই প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া।

এসআই মাসুদকে ঘিরেও বিতর্ক:
অনুসন্ধানে এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লার বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১২ জুন দুপুরে পৌরসভা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুল ইসলামের খাজা এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দুই কর্মচারীকে মারধর করেন তিনি।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা ঘটনাটিকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

আরও যেসব অভিযোগ উঠে আসে:
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়—চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যতা, জুলাই হত্যাকাণ্ডের অজ্ঞাতনামা মামলার ভয় দেখিয়ে হয়রানি, ঘুষ বাণিজ্যের বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি।

এ ছাড়া ওসি মাহফুজুর রহমানের অতীত কর্মস্থল ফেনীতে দায়িত্ব পালনকাল নিয়েও কিছু অভিযোগ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য:
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বোয়ালখালী থানায় অনিয়ম অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু ওসি মাহফুজুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে এবং বিভিন্ন সেবায় অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকে।

তাদের ভাষ্য, অভিযোগের পর অভিযোগ সামনে এলেও দৃশ্যমান জবাবদিহিতা না থাকায় থানার প্রতি মানুষের আস্থা কমতে থাকে।

অনুসন্ধানের প্রভাব:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরই বিষয়গুলো নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়।

তদন্তের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ওসি মাহফুজুর রহমান ও এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লাকে বোয়ালখালী থানা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সূত্রের পাওয়া তথ্য মতে ওসি মাহফুজুর রহমানকে শাস্তিমূলকভাবে দূরবর্তী রাজশাহী রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর বোয়ালখালী থানায় যোগ দিয়েছিলেন মাহফুজুর রহমান। প্রায় সাত মাস দায়িত্ব পালন শেষে রোববার ছিল তাঁর শেষ কর্মদিবস।

এদিকে ওসি মাহফুজুর রহমান এবং এসআই মাসুদ মোল্লাকে বোয়ালখালী থানা থেকে সরিয়ে নেওয়ার খবরে বোয়ালখালীর সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে।

এলাকার অনেক ভুক্তভোগী দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন এবং সুপ্রভাত চট্টগ্রাম অনলাইন অফিসে ফোন করে সাংবাদিকদের সাহস ও সততার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “গত ৫ আগস্টের পর আমরা ভেবেছিলাম পুলিশের জুলুম কমবে। কিন্তু ওসির অনিয়মে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। গণমাধ্যমের এই ভূমিকা আমাদের আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।”

একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কখনও কখনও শুধু সংবাদ নয়, জবাবদিহিতারও সূচনা করে। বোয়ালখালী থানার ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।

যদিও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলেছে, তবু অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, ফলাফল প্রকাশ এবং দায় নির্ধারণই এখন জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সুশীল সমাজ এবং আইনবিদদের মতে, কেবল বদলিই শেষ কথা নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারি কর্মকর্তা আইনের অপব্যবহার করার সাহস না পান।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি