কর্ণফুলী নদীতে মাছ ধরার ট্রলারে জীবিকার টানে নেমেছিলেন একদল মানুষ। কিন্তু এক নিমিষেই সেই স্বপ্ন পরিণত হলো জলন্ত অঙ্গারে।
চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে মাছ ধরার ট্রলার ‘এফভি দেশ’-এ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হলো আরও একটি নাম।
ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জীবনের শেষ লড়াইটা হেরে গেলেন জাহাজের তরুণ প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম।
আরও পড়ুন
শনিবার দিবাগত রাতে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তামিমের মৃত্যুর পর এই মর্মান্তিক ঘটনায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনজনে।
আজ রোববার বিকেলে নিজের চিরচেনা সন্দ্বীপ উপজেলার গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।
যে ছেলেকে ঘিরে পরিবারের কত শত স্বপ্ন ছিল, সে ছেলে আজ ফিরছে নিথর কফিনে। সন্দ্বীপের আকাশে-বাতাসে এখন শুধু স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ।
যেভাবে নরকে পরিণত হলো ইঞ্জিন কক্ষ
ভয়াল সেই ৩০ জুনের দুপুর। ঘড়িতে তখন পৌনে ১টা। সদরঘাটে নোঙর করা ‘এফভি দেশ’ ট্রলারে চলছিল স্বাভাবিক কাজকর্ম।
জাহাজের ক্যাপ্টেন জুবায়ের মাহমুদ সেই মুহূর্তের বিবরণ দিতে গিয়ে শিউরে ওঠেন।
তিনি জানান, হঠাৎ করেই ট্রলারের ইঞ্জিন কক্ষে এক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো কক্ষে।
কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। আর্তচিৎকার আর বাঁচার আকুতিতে ভারী হয়ে ওঠে কর্ণফুলীর পাড়।
ইঞ্জিন কক্ষে থাকা কর্মীরা অগ্নিশিখার গ্রাসে বন্দি হয়ে পড়েন।
স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় গুরুতর দগ্ধদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হলেও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকেরই। তবে ভেঙে চুরমার তিনটি পরিবার।
এই অগ্নিকাণ্ড কেবল তিনটি জীবনই কেড়ে নেয়নি, ধ্বংস করে দিয়েছে তিনটি পরিবারকে। এর আগে গত ৩০ জুন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ইঞ্জিন বিভাগের গ্রিজার মো. রুবেল (৩২) ও শাহ আলম (৪০)।
আর বাকিদের বাঁচানোর আকুল আকুতি নিয়ে চিকিৎসকদের প্রাণান্তকর চেষ্টার পর গতকাল রাতে বিদায় নিলেন প্রকৌশলী তামিম।
অলৌকিক বেঁচে ফেরা ও ট্রমার গল্প
এদিকে আগুনের লেলিহান শিখা এতটাই তীব্র ছিল যে, পাশে নোঙর করে রাখা ‘এফভি ডিজনি’ নামের আরেকটি ট্রলারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দগ্ধ হন সেই ট্রলারের নাবিক নিজাম উদ্দিন, মো. রাসেল ও ছিদ্দিক আহমেদ।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করে অবশেষে তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
শরীর থেকে আগুনের ক্ষত হয়তো মুছে যাবে, কিন্তু চোখের সামনে সহকর্মীদের পুড়ে যাওয়ার সেই বীভৎস স্মৃতি তারা সারাজীবনেও ভুলতে পারবেন কি না-তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
নদী যাদের জীবিকা দেয়, সেই নদীই কেন বারবার এমন ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বন্দরনগরীর সদরঘাটে।
একটি বিস্ফোরণ, আর তাতেই নিভে গেল তিনটি তাজা প্রাণ—এই দায় কার, তা খতিয়ে দেখার দাবি সচেতন মহলের।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

