মুষলধারে বৃষ্টি। চারপাশ নিঝুম, গভীর রাত। দিনের ক্লান্তি শেষে উখিয়ার শরণার্থী শিবির ও স্থানীয় জনপদের মানুষগুলো যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, ঠিক তখনই নেমে এলো প্রকৃতির সেই চেনা কিন্তু নির্মম নিয়তি।
মুহূর্তের মধ্যে বিশাল মাটির স্তূপ ধসে পড়ল ঘুমন্ত মানুষের ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাটির নিচে চাপা পড়ে নিভে গেল চার শিশু ও নারীসহ ৮টি তাজা প্রাণ।
রোববার (৫ জুলাই) দিবাগত গভীর রাতে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ পৃথক তিনটি স্থানে এই ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে।
সোমবার (৬ জুলাই) সকালে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা এই হৃদয়বিদারক তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, রাত তখন আনুমানিক ১টা ১০ মিনিট। উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের (৪৪) ঘরে হঠাৎ ধসে পড়ে পাহাড়ের বিশাল এক খণ্ড মাটি। মাটির ভারে দুমড়ে-মুচড়ে যায় ঘরটি।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় কামাল হোসাইন, তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং মাত্র ৪ বছরের শিশুসন্তান মোহাম্মদ আনাসের নিথর দেহ।
একই ঘটনায় আরও দুইজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। একটি সাজানো পরিবার নিমেষেই মিশে গেল মাটির সাথে।
এই ট্র্যাজেডির রেশ কাটতে না কাটতেই রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে হানা দেয় আরেক বিপর্যয়।
পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা ভারী মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম নামের ৭ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা শিশু। সে ওই ক্যাম্পের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে।
ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, ঘটনার পরপরই রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা মিলে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
মৃত্যুর এই মিছিল শেষ হয়নি এখানেই। রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে ঘটে শেষ আঘাতটি। সেখানে পাহাড় ধসে নারী ও শিশুসহ একই সাথে চারজনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন-আব্দুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩)।
অন্য দুজন হলেন মোহাম্মদ রশিদের দুই শিশুসন্তান মোহাম্মদ রিহান (৫) ও তার ভাই হারুনুর রশিদ (৩)। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও একজন।
ঝুঁকিতে হাজারো প্রাণ, চলছে মাইকিং
উখিয়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, “ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ের পাদদেশে বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যারা এখনো অবস্থান করছেন, তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। মানুষের জীবন রক্ষার্থে আমরা সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি।”
আরও দুই দিন ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবেই এই বৈরী আবহাওয়া।
আরও অন্তত দুই দিন এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, যা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবছর বর্ষা এলেই পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে মৃত্যুর এই পরোয়ানা।
উখিয়ার বাস্তুচ্যুত এই মানুষগুলোর জীবনে আশ্রয় মিললেও, প্রকৃতির এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি মেলেনি আজও।
নিখোঁজ বা নতুন কোনো ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে পুরো এলাকায়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

