সাগরের চোরাবালিতে ডায়মন্ড সিমেন্টের রহস্যময় ‘রুট’: কোস্ট গার্ডের জালে ২২ পাচারকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:২৭

চট্টগ্রাম বহিঃনোঙরের উত্তাল সমুদ্রে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের স্পিডবোটগুলো তীব্র গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে নিয়মিত চোরাচালানবিরোধী অভিযান।

কিন্তু ১৩ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে পতেঙ্গা আউটপোস্টের বিশেষ দল যখন সন্দেহভাজন তিনটি কার্গো বোটে তল্লাশি চালায়, তখন বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) নকল মোড়কে মোড়কজাত ২৫০ বস্তা ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার এবং ১৪ লাখ টাকা মূল্যের ২ হাজার ৪০০ বস্তা ডায়মন্ড সিমেন্টসহ আটক করা হয় ২২ জন পাচারকারীকে।

প্রাথমিকভাবে এটিকে সাধারণ একটি চোরাচালানের ঘটনা মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

কেন বারবার আলোচনায় একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড?

চট্টগ্রামে ডজনখানেক খ্যাতনামা সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সগৌরবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশেও রপ্তানি করছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাগরপথে চোরাচালানবিরোধী যতগুলো বড় অভিযান পরিচালিত হয়েছে, সেখানে বারবার একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের নামই সামনে আসছে-‘ডায়মন্ড সিমেন্ট’।

অপরাধ বিজ্ঞানের সাধারণ সূত্র বলে, একই ঘটনা বারবার ঘটা কখনো কাকতালীয় হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট মহলে এখন জোর আলোচনা, কেন পাচারকারীদের প্রথম পছন্দ এই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিমেন্ট?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সীমান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানালেন, “একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই রুটটি ব্যবহার করছে। তবে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য বারবার জব্দ হওয়ার বিষয়টি অবশ্যই গভীর খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।”

সরবরাহ ব্যবস্থা নাকি ডিলার নেটওয়ার্ক: গলদ কোথায়?

হাজার হাজার বস্তা সিমেন্ট যখন একটি কারখানা থেকে বের হয়, তখন তার প্রতিটি চালানের নির্দিষ্ট গন্তব্য ও রসিদ থাকার কথা।

এত বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট কীভাবে খোলাবাজার বা ডিলারদের হাত ঘুরে সরাসরি মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে কার্গো বোটে উঠে গেল, তা কোনো সাধারণ চুরি বা চোরাচালান হতে পারে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানে তিনটি সম্ভাবনার যেকোনো একটি সত্য হতে পারে।

১। ডিলারদের একাংশের গোপন সংশ্লিষ্টতা: কোম্পানির অনুমোদিত কোনো ডিলার হয়তো অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পাচারকারী চক্রের কাছে সরাসরি পণ্য সরবরাহ করছে।

২। কোম্পানির সরবরাহ ব্যবস্থার (Supply Chain) দুর্বলতা: পণ্য কার কারখানা থেকে বের হয়ে কোথায় যাচ্ছে, তার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির অভাব।

৩। ব্র্যান্ডের সুনাম ব্যবহার: পাচারকারীরা হয়তো ইচ্ছে করেই এই ব্র্যান্ডটিকে বেছে নিচ্ছে ওপারে এর চাহিদার কারণে, যা কোম্পানির অজান্তেও হতে পারে।

তবে কারণ যাই হোক না কেন, দায় এড়ানোর সুযোগ কি সংশ্লিষ্ট সিমেন্ট কোম্পানির আছে?

নিয়ম অনুযায়ী, কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তি ও জব্দ করা মালামালের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান।

কিন্তু সাধারণ অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের মামলায় সাধারণত ঘাটের শ্রমিক, বোটের মাঝি বা নিম্নস্তরের বাহকেরাই গ্রেপ্তার হয়।

পর্দার আড়ালে থাকা মূল অর্থায়নকারী বা গডফাদাররা বরাবরই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

বারবার একই কোম্পানির পণ্য জব্দ হওয়ার পরও কোস্ট গার্ড, পুলিশ বা অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থা কি সংশ্লিষ্ট সিমেন্ট কোম্পানিকে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিয়েছে?

কিংবা কোম্পানিটি নিজে থেকে তাদের ডিলার নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখতে কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে? এখন পর্যন্ত এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক জবাব মেলেনি।

রাষ্ট্রীয় সার ও বেসরকারি খাতের সিমেন্ট এভাবে সীমান্ত পার হয়ে চলে যাওয়া কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও এক বড় উদ্বেগ।

ডায়মন্ড সিমেন্ট কিংবা বিএডিসির নকল মোড়কের আড়ালে যে সিন্ডিকেটটি সক্রিয়, তাদের শিকড় উপড়ে ফেলা না গেলে এই ধরনের সাময়িক জব্দ কেবল সমুদ্রের জলরাশির ওপর সাময়িক দাগ কাটার মতোই অর্থহীন হয়ে পড়বে।

তদন্তকারী সংস্থাগুলোর উচিত কেবল ‘বাহক’ ২২ জন মাঝিকে নয়, বরং এই পণ্যগুলোর উৎস ও অর্থায়নের মূল হোতাদের খুঁজে বের করা।

প্রশাসন কি পারবে সেই নেপথ্যের কারিগরদের মুখোশ উন্মোচন করতে? উত্তরটি সময়ের অপেক্ষায়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি