ফাইলে দুর্নীতির দাগ, চেয়ারে অসীম ক্ষমতা: প্রকৌশলী হাসানের অদৃশ্য রক্ষাকবচ কোথায়?

প্রশ্নের মুখে সিডিএর প্রশাসনিক কাঠামো

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬ ১৬:১৪

একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের একাধিক দুর্নীতি মামলা। তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল হয়েছে পুলিশি চার্জশিটও।

আইনি ও প্রশাসনিক নিয়ম বলে, এমন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কর্মকর্তা থাকবেন নজরদারিতে, মুক্ত থাকবেন যেকোনো নীতি-নির্ধারণী দায়িত্ব থেকে।

কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) যেন প্রচলিত প্রশাসনিক আইনের ঠিক উল্টো স্রোত প্রবাহিত হয়েছে।

সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান শুধু চাকরি বাঁচিয়ে রাখেননি, বরং বছরের পর বছর দখল করে রেখেছিলেন সংস্থাটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও স্পর্শকাতর ‘অথরাইজড অফিসার-১’-এর পদটি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গুরুতর মামলার আসামি হয়েও কীভাবে একজন কর্মকর্তা নগর উন্নয়নের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠলেন এবং কার শক্তিতে দীর্ঘ সময় তার এই অনাক্রম্যতা (Impunity) বজায় ছিল-তা নিয়ে এখন সিডিএর ভেতরের ও বাইরের প্রশাসনিক কাঠামো মারাত্মক প্রশ্নের মুখে।

১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও চার্জশিটের ছায়া

ঘটনার শেকড় ২০১০ সালে। কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ২৮ হাজার ৪৫২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন একাধিক মামলা দায়ের করে।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশ করে সরকারি অর্থ হরিলুট ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।

চান্দগাঁও থানায় দায়ের করা এসব মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ১০৯ (সহযোগিতা) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা যুক্ত করা হয়।

তদন্ত শেষে ২০১২ সালের মে মাসে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে ৪০/২০১২, ৪১/২০১২ এবং ৪৩/২০১২ নম্বর বিশেষ দুর্নীতি মামলা বিচারাধীন।

কিন্তু জামিনে মুক্ত হয়েই তিনি সিডিএর শীর্ষ ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ক্ষমতার বলয় ও ‘নকশা বাণিজ্য’ সিন্ডিকেট:

নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জামিনে থাকা অবস্থায়ই মোহাম্মদ হাসানকে সিডিএর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘অথরাইজড অফিসার-১’ পদে পদায়ন করা হয়।

এটি এমন এক পদ, যা চট্টগ্রাম নগরীর সমস্ত ইমারত নির্মাণ, নকশা অনুমোদন ও তলা বৃদ্ধির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

সিডিএর অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ করে সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের দায়িত্বকালকে কেন্দ্র করে সংস্থাটিতে এক অপ্রতিহত রাজনৈতিক বলয় গড়ে ওঠে।

এই বলয়ের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন প্রকৌশলী হাসান। তার ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা ভবন বিধিমালা লঙ্ঘন, অনুমোদিত তলার অতিরিক্ত নির্মাণ, নকশা রদবদল এবং সংশোধিত প্ল্যান অনুমোদনে প্রশাসনিক শিথিলতা দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার অনিয়মে লিপ্ত হয়।

বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকায় একটি মসজিদের বহুতল ভবনের বিতর্কিত অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতাও এই প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত।

বিশ্লেষকদের মতে “কোনো কর্মকর্তা মামলার আসামি হলেও চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত অপরাধী সাব্যস্ত হন না-এটি আইনের সাধারণ নিয়ম। কিন্তু সেই অজুহাতে চার্জশিটভুক্ত আসামির হাতেই ইমারত অনুমোদনের মতো বিপুল ক্ষমতার চাবিকাঠি সঁপে দেওয়া প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।”

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিলম্বিত পদক্ষেপ

দীর্ঘদিন রাজনৈতিক চাদরে ঢাকা পড়ে থাকা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মী ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে সিডিএর ভেতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

চাপের মুখে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন: ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সিডিএ চাকরি প্রবিধানমালার ৪০(ঙ) ধারা অনুযায়ী সচিব রবীন্দ্র চাকমার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে মোহাম্মদ হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

পরের বছর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ‘অথরাইজড অফিসার-১’-এর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় এবং সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী কাদের নেওয়াজকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়।

তবে সচেতন নাগরিক সমাজের প্রশ্ন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে এত বছর দেরি হলো কেন?

এসব অভিযোগ ও জটিলতা প্রসঙ্গে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন গণমাধ্যমে জানান, “প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়টি আমিও শুনেছি। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিকভাবে কী করণীয়, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”

অন্যদিকে, একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান বা তার আইনজীবীর পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকের মামলাগুলোতে মোহাম্মদ হাসান ছাড়াও সিডিএর বর্তমান ও সাবেক একাধিক প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীর নাম রয়েছে।

অর্থাৎ অনিয়মের শিকড় কেবল একক ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা পুরো সংস্থায় বিস্তৃত।

বিচারাধীন মামলার আসামিকে যুগ পার করে ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে রাখার এই ইতিহাস সিডিএর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কঙ্কালসার রূপকেই উন্মোচিত করে।

চট্টগ্রাম নগরীর সুপরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু একজন কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরানোই যথেষ্ট নয়, বরং গত এক দশকে সিডিএতে ক্ষমতার যে অপব্যবহার ও নকশা জালিয়াতি হয়েছে, তার নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত এবং আদালতের বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এখন সময়ের দাবি।

তা না হলে, কোনো প্রশাসনিক রদবদলই জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি