হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তোলার কথা বলে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিলেন স্বামী। কিন্তু সেই আশ্বাসের আড়ালে যে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা, তা হয়তো ঘুণাক্ষরেও টের পাননি স্ত্রী।
অসুস্থ স্ত্রীকে উন্নত চিকিৎসার অজুহাতে পটিয়া থেকে চট্টগ্রাম শহরে এনে কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি, বরং তোলা হয়েছিল বহদ্দারহাটের একটি আবাসিক হোটেলের বন্ধ ঘরে।
এরপর সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় ২২ বছরের তরুণী শাহনাজ বেগমের নিথর দেহ।
স্ত্রীকে এই পরিকল্পিত হত্যার দায়ে অবশেষে ঘাতক স্বামী মো. নেজাম উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) চট্টগ্রামের পঞ্চম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. তাজউল ইসলামের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া ও নয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামি নেজাম উদ্দিনকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী এস এম কাওসার সাগর রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আসামি মো. নেজাম উদ্দিনকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে আদেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, রায় ঘোষণার সময় আসামি নেজাম উদ্দিন আদালতে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। পরে সাজা পরোয়ানামূলে তাঁকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার নথি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে পটিয়া উপজেলার মৃত কবির আহমদের ছেলে মো. নেজাম উদ্দিনের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় শাহনাজ বেগমের (২২)।
সংসার শুরুর এক বছরের মাথায়, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন শাহনাজ।
তখন স্বামী নেজাম উদ্দিন আশ্বাস দেন, গ্রামে ভালো চিকিৎসা হবে না। শাহনাজকে চট্টগ্রাম নগরীতে নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখানো দরকার।
স্ত্রীর চিকিৎসার কথা বলে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে পটিয়া থেকে শাহনাজকে নিয়ে নগরীর উদ্দেশ্যে রওনা হন নেজাম।
তবে তিনি স্ত্রীকে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিয়ে যাননি। নিয়ে যান নগরীর চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট এলাকার স্বজন সুপার মার্কেট সংলগ্ন ‘হোটেল আল-রেজা’ তে।
সেখানকার ৩১৯ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন তারা। আর সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষেই চিরতরে নিভে যায় শাহনাজের জীবনের প্রদীপ। রহস্যজনকভাবে ওই হোটেল কক্ষ থেকেই উদ্ধার করা হয় শাহনাজের মৃতদেহ।
ঘটনার পরপরই নিহতের বাবা মো. আজগর আলী অভিযোগ তোলেন, তাঁর মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে চান্দগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশি তদন্ত শেষে আসামি নেজাম উদ্দিনকে এককভাবে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।
এরপর ২০১৪ সালের ১৮ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু করেন আদালত।
একে একে নয়জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে আদালত এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করলেন।
চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে স্ত্রীকে ডেকে এনে হত্যার যে নির্মম অধ্যায় ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে আদালতের এই সাজার মাধ্যমে তার বিচারিক যবনিকা ঘটল।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

