চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের অন্যতম এক আতঙ্কের নাম মোবারক হোসেন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’।
দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী অপরাধ সাম্রাজ্য গুটিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সেরে ফেলেছিলেন তিনি।
নাম বদলে সেজেছিলেন ভারতীয় নাগরিক ‘আজহার খান’, পকেটে ছিল জাল আধার কার্ডও। কিন্তু সুচতুর এই পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে জালে তুলেছে।
যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে গোপন অভিযানে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গ্রেফতারের পর তার দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল, এলজি ও বেশ কিছু দেশীয় মারাত্মক অস্ত্র।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অপরাধের জাল গুটিয়ে দেশের সীমানা পার হওয়ার একদম শেষ মুহূর্তে ছিলেন ডেভিড ইমন।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে দেশের একাধিক জেলায় ঝোড়ো অভিযান চালায় পুলিশ। অবশেষে যশোরের সীমান্তসংলগ্ন ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের সময় ইমনের কাছ থেকে ‘আজহার খান’ নামের একটি ভুয়া ভারতীয় আধার কার্ড জব্দ করে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টানা নজরদারির পর যশোর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়।
তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, সীমান্তের ওপারে তাকে নিরাপদে গ্রহণ করার জন্য একটি চক্র প্রস্তুত ছিল। ভারতে স্থায়ীভাবে আত্মগোপনে যাওয়ার জন্যই মূলত এই ভুয়া আধার কার্ডটি তৈরি করেছিলেন তিনি।
গ্রেফতারের পর পুলিশের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খুলতে বাধ্য হন ডেভিড ইমন। বের হয়ে আসে তার অস্ত্র ভাণ্ডার ও অপরাধচক্রের একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামের এক পরিত্যক্ত বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়, ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি এলজি (দেশীয় বন্দুক) ও বেশ কয়েকটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডেভিড ইমনের এই অস্ত্র সরবরাহের নেপথ্যে ছিল পার্বত্য অঞ্চলভিত্তিক একটি সশস্ত্র সংগঠন।
পাহাড়ি ওই সংগঠন থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করেই চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং আধিপত্য বিস্তার করতো তার গ্যাং।
তদন্তে উঠে এসেছে এক আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কের চিত্র। ডেভিড ইমন ও তার সহযোগী রায়হান মিলে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় একটি সুসংগঠিত চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা এই চাঁদার অর্থের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে চলে যেতো ভারতে অবস্থানরত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর কাছে।
এছাড়া নিজেদের আড়াল রাখতে এবং আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচতে চাঁদার অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন প্রভাবশালী তদবিরকারীর পেছনেও ঢালা হতো বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
ডেভিড ইমনের মতো ধুরন্ধর সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় আনা সহজ ছিল না। এর নেপথ্যে রয়েছে পুলিশের এক সুনির্দিষ্ট ও প্রযুক্তিভিত্তিক দীর্ঘ তদন্ত।
গত ১৩ জুন চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী এলাকায় মাকসুদুল হক চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি নৃশংসভাবে খুন হন।
সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ, কল ট্র্যাকিং ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ প্রথমে গ্রেফতার করে ‘ধামা ইলিয়াস’ নামে এক অপরাধীকে।
পরবর্তীতে ইলিয়াসের মুখে স্বীকারোক্তি পেয়েই যশোরে ডেভিড ইমনের গোপন আস্তানায় হানা দেয় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
পুলিশের খাতায় ডেভিড ইমন একজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ও আশপাশের থানায় হত্যা, অবৈধ অস্ত্র বহন এবং চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৩টি গুরুতর মামলা রয়েছে।
তাছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীসহ রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুরো সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

