নকল যন্ত্রাংশ সরবরাহ, কমিশন বাণিজ্য আর সরকারি অর্থ আত্মসাতের বহুমুখী অভিযোগে জরাজীর্ণ বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম প্রধান মেরামত কারখানা-পাহাড়তলী ডিজেল শপ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার আসামি হয়ে এবং প্রশাসনিক বদলির আদেশ থাকার পরও পদটি আঁকড়ে আছেন এখানকার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) এতেশাম মো. শফিক।
অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে আদেশ অমান্য করেই বহাল রয়েছেন তিনি।
ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি তার প্রতিষ্ঠিত সিন্ডিকেটের হাত ধরে পঙ্গু হয়ে পড়েছে পুরো রেলের ইঞ্জিন সরবরাহ ব্যবস্থা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড়তলী ডিজেল শপে প্রায় পাঁচ বছর ধরে অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব পালন করছেন এতেশাম মো. শফিক।
মাঝে একবার অন্য কর্মকর্তা দায়িত্ব পেলেও অদৃশ্য প্রশাসনিক বলয়ে তদবিরের মাধ্যমে আবারও গুরুত্বপূর্ণ এই চেয়ারটি নিজের দখলে নেন তিনি।
সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট রেল মন্ত্রণালয়ের পার্সোনেল-১ শাখার উপপরিচালক স্বাক্ষরিত আদেশে শফিককে পার্বতীপুরে বদলি করা হয়। তবে আদেশের দুই সপ্তাহ পার হতে চললেও তিনি শপের দায়িত্ব ছাড়েননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কোটি কোটি টাকার বাজেট থেকে কমিশন বাণিজ্যের শেষ কিস্তি পকেটে না পোরা পর্যন্ত দায়িত্ব না ছাড়ার ছক কষেছেন তিনি।
অপর একটি সূত্র বলছে, রেলের ইঞ্জিন সচল রাখতে ব্যবহৃত আমেরিকান (ইএমডি) মানসম্মত যন্ত্রাংশের পরিবর্তে শফিকের সিন্ডিকেটে অবাধে ঢুকছে নিম্নমানের ভারতীয় ও দেশীয় ডুপ্লিকেট পার্টস।
নগরীর কদমতলী এলাকার সেলিম এবং সিডিএ মার্কেটসহ ঢাকা-কুমিল্লার নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারী সহেল নামের দুই ব্যক্তির মাধ্যমে এসব ভুয়া যন্ত্রাংশ শপে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ঠিকাদারদের ওপর নির্দিষ্ট কিছু স্থান থেকেই এসব নিম্নমানের পার্টস কেনা বাধ্যতামূলক করে সেখান থেকে বিপুল অঙ্কের কমিশন বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শফিকের বিরুদ্ধে।
নথিপত্র বিশ্লেষণ ও সরেজমিনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, যন্ত্রাংশ ক্রয়ে চরম পুকুরচুরি চালানো হয়েছে।
‘উইক এসএ’ নামের একটি অতি ক্ষুদ্র পার্টস, যার প্রকৃত বাজারমূল্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকা-তার ভুয়া বিল প্রস্তুত করে উত্তোলন করা হয়েছে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত।
শাওন, সাইফুল, বাচ্চু, অর্ডেন, জাহিদ, রবিউল ও মোজাম্মেল নামের কতিপয় ঠিকাদার এবং দ্য জায়েন্ট, এআরএম, এলাহি ব্রাদার্স, এলাহী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ টেক অ্যান্ড টেকনিক, জাহিদ ইন্টারন্যাশনাল ও এএনজি এন্টারপ্রাইজ-এই কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই ঘুরেফিরে সব ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পাদন করছেন কর্মব্যবস্থাপক।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজেও এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অংশীদারত্বে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিম্নমানের পার্টস সংযোজনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে রেলওয়ের শিডিউল ইঞ্জিনের সরবরাহে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাহাড়তলী শপ থেকে ৩৪টি শিডিউলড ইঞ্জিন প্রস্তুত করে সরবরাহ করার কথা থাকলেও শফিকের তদারকিহীনতা ও নিম্নমানের সামগ্রীর কারণে মাত্র ২২টি ইঞ্জিন ছাড়পত্র পেয়েছে। সূত্র-ডিএস
তার ওপর, মেরামত শেষে পাঠানো ইঞ্জিনের একটি বড় অংশ ট্র্যাকে চলার কয়েক দিনের মধ্যেই পুনর্নবীকরণ ত্রুটি নিয়ে আবারও কারখানায় ফেরত আসছে। ইঞ্জিন সংকটে নিয়মিত ট্রেন চলাচল চরম বিপর্যয় ও বিলম্বের মুখে পড়েছে।
সময়মতো ট্রেন চালাতে না পারায় দেশের বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীদের তীব্র ক্ষোভের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের নিরীহ কর্মীদের, যা একাধিক স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ও হামলার রূপ নিয়েছে।
দুদকের মামলার পর ও চেয়ার অক্ষত
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাল কাগজপত্র ও ক্রয়ের ভুয়া রেকর্ড প্রস্তুত করে সরকারের ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৭২৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এতেশাম মো. শফিকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল কবির পলাশ বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করলেও গত দু’বছরে তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উল্টো একটি দুর্নীতি মামলার আসামি হয়ে কীভাবে রেলের কোটি কোটি টাকার মেরামত বাজেটের দায়িত্বে বহাল থাকেন, তা নিয়ে রেল ভবনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নীতি-নৈতিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এসব গুরুতর অনিয়ম ও সরকারি আদেশের পরও দায়িত্ব না ছাড়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) এতেশাম মো. শফিকের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তীতে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
বিষয়গুলো নিয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীনের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এতেশাম মো. শফিক বা রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

