আনোয়ারায় জোড়া খুন: মৃত্যুর আগে এনির মুখে উচ্চারিত নাম, দুদিন পর গ্রেপ্তার তেজু বড়ুয়া

আলোচিত হত্যাকাণ্ডে কী বলছে তদন্ত?

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ১১:৫৩

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চেনামতি বড়ুয়া পাড়ার সেই রক্তাক্ত রাতের পর কেটে গেছে দুই দিন। কিন্তু এখনো স্বজনদের কান্না থামেনি, থামেনি মানুষের কৌতূহলও।

কী কারণে এক মা ও তার কিশোরী মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো? কেনই বা হামলার শিকার হলো পরিবারের পাঁচ বছরের শিশুপুত্র?

এমন অসংখ্য প্রশ্নের মধ্যেই আলোচিত এই জোড়া হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড় এনে দিয়েছে প্রধান সন্দেহভাজন রিমন বড়ুয়া প্রকাশ তেজু বড়ুয়ার গ্রেপ্তার।

রোববার (১৪ জুন) রাতে পটিয়া থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মামলার প্রধান আসামিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে।

যে রাত বদলে দিল একটি পরিবারের জীবন
গত ১৩ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া এলাকায় ঘটে যায় হৃদয়বিদারক এ ঘটনা।

নিহত হন এনি বড়ুয়া (৪০) এবং তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। গুরুতর আহত হয় পরিবারের পাঁচ বছর বয়সী শিশু পিয়াস বড়ুয়া।

একটি স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনের মধ্যে এমন ভয়াবহ হামলার ঘটনা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের আবহ তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এত নৃশংস ঘটনা এলাকায় আগে খুব কমই ঘটেছে।

মৃত্যুর আগে উচ্চারিত একটি নাম
তদন্তের শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল নিহত এনি বড়ুয়ার মৃত্যুর আগে দেওয়া তথ্য।

স্বামী সুজন বড়ুয়ার দাবি, হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় এনি বড়ুয়া তেজু বড়ুয়ার নাম উল্লেখ করেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সেই বক্তব্য তদন্তকারীদেরও জানানো হয়।

পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তও ধীরে ধীরে একই দিকেই অগ্রসর হতে থাকে। অবশেষে ঘটনার দুই দিনের মাথায় গ্রেপ্তার করা হয় রিমন বড়ুয়া প্রকাশ তেজু বড়ুয়াকে।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকারোক্তি বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি।

আর্থিক লেনদেনের বিরোধ কি হত্যার সূত্র?
ঘটনার পর থেকেই সামনে আসে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি।

সুজন বড়ুয়ার ভাষ্যমতে, তেজু বড়ুয়ার সঙ্গে তাদের কিছু আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধ চলছিল। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন, ওই লেনদেনসংক্রান্ত কাগজপত্রের খোঁজে এসে হামলার ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও বলছে, আর্থিক বিরোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কারণ, অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব কিংবা অন্য কোনো গোপন বিরোধও বড় ধরনের অপরাধের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই তদন্তকারীরা কোনো একটি সম্ভাবনার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছেন না।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পেছনের দরজা?
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হামলাকারীর প্রবেশপথ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তথ্য এবং আশপাশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারী বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারে।

এই পর্যবেক্ষণ তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, এতে এমন একটি সম্ভাবনা সামনে এসেছে যে হামলাকারী হয়তো পরিবারের পরিচিত কেউ ছিল।

অপরিচিত কারও পক্ষে গভীর রাতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো তুলনামূলকভাবে কঠিন। ফলে পরিচিত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনাই তদন্তে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে যা বলেছিলেন এসপি:
রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।

পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, ঘটনার পর থেকেই একাধিক টিম একযোগে কাজ করছে। আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এবং স্থানীয় থানা পুলিশের সদস্যরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছেন।

তখনই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তদন্তে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

তার ভাষায়, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে একজন সন্দেহভাজন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে।

তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা সম্ভব না হলেও তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা যাবে বলে আশাবাদী ছিল পুলিশ। কয়েক ঘণ্টা পরই সেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি :
প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হলেও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বরং গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

প্রথমত, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? দ্বিতীয়ত, হামলার সময় অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না? তৃতীয়ত, এটি কি আকস্মিক সংঘাতের ফল, নাকি পূর্বপরিকল্পিত হামলা? চতুর্থত, আর্থিক বিরোধের বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

তদন্তের পরবর্তী ধাপ:
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে।

গ্রেপ্তার হওয়া আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামতের ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।

তদন্তকারীদের মতে, গ্রেপ্তার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো বাকি—কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো এবং এর পেছনে আর কেউ ছিল কি না, সেই প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর বের করা।

শোক, আতঙ্ক আর অপেক্ষা:
চেনামতি বড়ুয়া পাড়ায় এখনো শোকের আবহ। একদিকে মা ও মেয়ের মৃত্যুর বেদনা, অন্যদিকে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া শিশু পিয়াসকে ঘিরে উৎকণ্ঠা।

দুই দিনের ব্যবধানে প্রধান সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার হওয়ায় তদন্তে গতি এসেছে। তবে স্বজন ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা একটাই—শুধু গ্রেপ্তার নয়, এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণও যেন দ্রুত উন্মোচিত হয়।

কারণ, আনোয়ারার মানুষ এখন জানতে চায়—সেই ভয়াল রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, আর কেনই বা এক পরিবারের ওপর নেমে এসেছিল এমন নির্মম ট্র্যাজেডি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি