প্রথমার্ধে ‘ডিফেন্স, দ্বিতীয়ার্ধে ‘ক্লিন সুইপ’: কানাডাকে উড়িয়ে শেষ আটে মরক্কো!

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫৭

ফুটবল ম্যাচ নাকি ৯০ মিনিটের এক চরম মনস্তাত্ত্বিক দাবা খেলা—তার আরও একটি ধ্রুপদী উদাহরণ দেখল বিশ্ব।

ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিট যারা প্রতিপক্ষের ঝড়ে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে যাওয়ার শঙ্কায় ছিল, তারাই শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠ ছাড়ল বীরের বেশে।

প্রথমার্ধের তীব্র চাপ আর চোটের ধাক্কা সামলে, দ্বিতীয়ার্ধের অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল মরক্কো

সহআয়োজক কানাডাকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে টুর্নামেন্টের প্রথম দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে উত্তর আফ্রিকার এই পরাশক্তি ‘আটলাস লায়ন্স’।

ম্যাচের শুরু থেকেই যেন মরক্কোকে গিলে খেতে চাইল কানাডা। হাই-প্রেসিং ফুটবল আর গতিময় আক্রমণের পসরা সাজিয়ে মরক্কোর রক্ষণভাগকে তটস্থ করে রাখে তারা।

খেলার মাত্র ষষ্ঠ মিনিটেই লিড পেতে পারত সহআয়োজকেরা, তবে জনাথন ডেভিডের একটি বুলেট গতির বিপজ্জনক শট বাজপাখির মতো ডাইভ দিয়ে রুখে দেন মরক্কোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু।

কানাডার আক্রমণের সেই ধারা বজায় ছিল ১২তম মিনিটেও। এবার টানি ওলুওয়াসেয়ির শক্তিশালী শট অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন বুনু। গোলপোস্টের নিচে বুনু যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

ম্যাচের প্রথম ধাক্কা: খেলার ২২তম মিনিটে বড় ধাক্কা খায় মরক্কো শিবির। দলের অন্যতম প্রাণভোমরা ইসমাইল সাইবারি চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে স্তব্ধ হয়ে যায় মরক্কোর ডাগআউট।

তাঁর পরিবর্তে মাঠে নামানো হয় সুফিয়ান রাহিমিকে, যা পরে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

মাঝমাঠের হাইড্রেশন বিরতির পর মরক্কো কিছুটা ছন্দ ফিরে পায়। ৩০তম মিনিটে বদলি নামা রাহিমির শট থেকে আসে দলটির প্রথম অন-টার্গেট প্রচেষ্টা, তবে তা সহজেই গ্লাভসবন্দি করেন কানাডার গোলরক্ষক ম্যাক্সিম ক্রেপো।

প্রথমার্ধের শেষদিকে ম্যাচে ছড়ায় চরম উত্তেজনা। আচরাফ হাকিমি ও রিচি লারিয়ার মধ্যে মৃদু সংঘর্ষের জেরে দুজনকেই হলুদ কার্ড দেখান রেফারি।

একে একে হলুদ কার্ডের খাতায় নাম লেখান জনাথন ডেভিড, আজেদ্দিন উনাহি এবং বিলাল এল খান্নুসও। শেষ পর্যন্ত যোগ করা ৬ মিনিট সহ গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে যায় দুই দল।

দ্বিতীয়ার্ধে ‘বদলে যাওয়া’ মরক্কো ও উনাহি-ম্যাজিক

বিরতি থেকে ফিরে দর্শকেরা মাঠে যা দেখল, তা যেন এক ভিন্ন মরক্কো। রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে বের হয়ে আক্রমণের পসরা সাজায় তারা। ৫০তম মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

অনুশীলনে করা নিখুঁত পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দেখায় মরক্কো। আচরাফ হাকিমির একটি বুদ্ধিদীপ্ত ছোট পাস থেকে বক্সের বাইরে বল পান আজেদ্দিন উনাহি।

কানাডার একঝাঁক ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে তাঁর নেওয়া নিখুঁত নিচু শটটি যখন জালের ঠিকানা খুঁজে নেয়, কানাডার গোলরক্ষক ক্রেপোর তখন স্রেফ চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। ১-০ তে এগিয়ে যায় মরক্কো।

গোল হজম করে সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে কানাডা। কিন্তু বুনুর নেতৃত্বাধীন মরক্কোর রক্ষণভাগ আজ ছিল লৌহকঠিন।

কানাডা যখন অল-আউট আক্রমণে, মরক্কো তখন ওত পেতে ছিল পাল্টা আক্রমণের। ৮২তম মিনিটে তেমনই এক বিদ্যুৎগতির কাউন্টার অ্যাটাক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন উনাহি।

বক্সে দুই ডিফেন্ডারের কড়া পাহাড়ার মধ্যেও দারুণভাবে বল ধরে রেখে সতীর্থকে পাস বাড়ান দিয়াজ। আর সেই নিখুঁত পাস থেকে চমৎকার ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-০ করেন উনাহি।

ম্যাচের ৮৭তম মিনিটে হেডে ক্রসবারে বল লাগিয়ে হ্যাটট্রিকের সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন সুফিয়ান রাহিমি। তবে যোগ করা সময়ের অষ্টম মিনিটে (৯৫+৮’) আর কোনো ভুল করেননি তিনি।

মাঝমাঠ থেকে দিয়াজের চমৎকার পাস ধরে বাম প্রান্ত দিয়ে একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে ডি-বক্সে ঢোকেন রাহিমি। এরপর এক মাপা নিচু শটে কানাডার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন তিনি (৩-০)।

⚽ ৫০' মিনিট: আজেদ্দিন উনাহি (১-০)
⚽ ৮২' মিনিট: আজেদ্দিন উনাহি (২-০)
⚽ ৯৫+৮' মিনিট: সুফিয়ান রাহিমি (৩-০)

প্রথমার্ধের চরম কৌশলগত চাপ কাটিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কোর কোচ যে মাস্টারপ্ল্যান সাজিয়েছিলেন, তাতেই কুপোকাত কানাডা। জোড়া গোল করে মরক্কোর জয়ের নায়ক আজেদ্দিন উনাহি, তবে সাইবারির চোটে বদলি হিসেবে নেমে দলের জয়ে সমান অবদান রেখেছেন সুফিয়ান রাহিমি ও অ্যাসিস্টদাতা দিয়াজ।

এই জয়ে প্রথম দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখল মরক্কো, আর বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি বাজল দুর্দান্ত লড়াই করা কানাডার।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি