উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিষয়, মাঠ প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক সুপারিশ এবং স্থানীয় জনমতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নতুন ঘোষিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলায় সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে একটি বিশেষ ‘স্বার্থান্বেষী মহলের’ প্রভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস. রহমান হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বৃহত্তর সুয়াবিল ইউনিয়ন অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ এই অভিযোগ তোলে।
সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দ্রুত এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সংশোধন করে সুয়াবিল ও নাজিরহাটের ওই তিনটি ওয়ার্ডকে নতুন উপজেলা থেকে বাদ না দেওয়া হলে ফটিকছড়িতে কঠোর আন্দোলনের দাবানল জ্বলবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ফোরামের মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া।
লিখিত বক্তব্যে ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, নতুন উপজেলা গঠনের সরকারি উদ্যোগকে তাঁরা সাধুবাদ জানান।
তবে তা জনগণের মতামত, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও দেশের উচ্চ আদালতের বিচারাধীন বিষয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হতে পারে না।
তিনি কিছু সুনির্দিষ্ট নথির তথ্য তুলে ধরে দাবি করেন,
বিগত প্রস্তাবনা: ২০২১ ও ২০২৩ সালে উপজেলা প্রশাসনের পাঠানো ‘ভুজপুর উপজেলা’ গঠনের প্রস্তাব এবং জেলা প্রশাসকের সরেজমিন প্রতিবেদনে সুয়াবিল ইউনিয়ন ও নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা: এমনকি স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারির এক নির্দেশনায় সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ওই তিনটি ওয়ার্ড বাদ দিয়েই নতুন প্রস্তাব তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিল।
নিকার বৈঠক: এই বিষয়টির ওপর মহামান্য হাইকোর্টে একাধিক রিট মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও, গত ১ জুলাই জাতীয় বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় সংক্রান্ত কমিটির (নিকার) সভায় বিতর্কিত এই প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত রহস্যজনক।
নেপথ্যে কি ভূমি ব্যবসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ?
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগের আঙুল তোলা হয় স্থানীয় ভুজপুর ও হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের দুই চেয়ারম্যানের দিকে।
অভিযোগ করা হয়, তাঁরা পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে সুয়াবিল ইউনিয়নকে নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
এর পেছনে বিপুল পরিমাণ ভূমির ব্যবসা ও ব্যক্তিস্বার্থ জড়িত থাকতে পারে দাবি করে ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ভৌগোলিক দূরত্বের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। বর্তমানে সুয়াবিল ইউনিয়ন থেকে বর্তমান ফটিকছড়ি উপজেলা সদরের দূরত্ব মাত্র ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার।
কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সাধারণ মানুষকে প্রশাসনিক সেবা নিতে যেতে হবে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের প্রস্তাবিত উপজেলা সদরে।
এর ফলে সাধারণ মানুষের সময়, যাতায়াত ব্যয় এবং প্রশাসনিক দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ফোরামের ৪ দফা দাবি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংবাদ সম্মেলন থেকে চার দফা দাবি পেশ করা হয়:
ঘোষিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা থেকে সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড অনতিবিলম্বে বাদ দেওয়া।
জনমত ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনা করে পুরো সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা।
হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলাগুলো নিষ্পত্তি হওয়ার আগে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর না করা।
স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করা।
ফোরামের নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই চার দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে বৃহত্তর সুয়াবিলবাসী চুপ করে বসে থাকবে না।
আগামী দিনগুলোতে গণসমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ ধারাবাহিক ও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফোরামের সংগঠক অধ্যক্ষ নুরুল হুদা, এস. এম শফিউল আলম, ডা. এস. এম. ফরিদ, সুয়াবিল প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল মনসুর, হাফেজ মিজানুল হক, ইউপি সদস্য মিন্টু, বেলাল, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, মোহাম্মদ শাহাজাহান, হামিদ, আবু সৈয়দ, জয়নাল, শাহাজাহান মোহাম্মদ নুর, ওমর ফারুক মানিক, রাশেদ কোম্পানি এবং কাউন্সিলর গাজী আমানুল্লাহ প্রমুখ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

