মহাসড়কে ডাকাতদলের হিংস্রতার বলি হলেন ট্রাক চালক জামাল!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাপাতির কোপ নিয়েও চালালেন ট্রাক, ফেনীতেই শেষ নিঃশ্বাস!

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬ ১৪:০৫

ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উজানিশার ব্রিজ এলাকায় কুয়াশা আর অন্ধকারে ঢাকা পথ পেরিয়ে চট্টগ্রামের দিকে ছুটে চলেছে একটি পণ্যবাহী ট্রাক।

চাকায় গতি আছে, কিন্তু কে জানত সেই গতির সমান্তরালে ওত পেতে আছে একদল যমদূত! আকস্মিক এক ঝটকায় ভেঙে গেল চলন্ত ট্রাকের ডান পাশের কাচ।

৫ থেকে ৬ জনের এক অজ্ঞাত ডাকাত দল ভেতরে ঢুকেই এলোপাতাড়ি চালাতে লাগল ধারালো চাপাতি। লক্ষ্য লুটপাট। কিন্তু তাদের সেই হিংস্রতার বলি হলেন ৫৬ বছর বয়সী এক সাধারণ চালক, মো. জামাল উদ্দিন।

চাপাতির আঘাতে শরীর ক্ষতবিক্ষত, ফিনকি দিয়ে ছুটছে রক্ত। স্টিয়ারিং ধরে রাখাই যেখানে অসম্ভব, সেখানে এক অবিশ্বাস্য লড়াই লড়লেন জামাল উদ্দিন।

যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতেও তিনি ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ হারাননি। কারণ তিনি জানতেন, চলন্ত ট্রাক থামলে ডাকাতদের তাণ্ডব আরও বাড়বে, কিংবা ঘটতে পারে বড় কোনো সড়ক দুর্ঘটনা।

রক্তাক্ত শরীর নিয়েই তিনি ট্রাকটিকে টেনে নিয়ে গেলেন বেশ কিছুদূর। যখন বুঝলেন শরীর আর সায় দিচ্ছে না, চোখের সামনে নেমে আসছে চিরতরের অন্ধকার, তখন পরম ভরসায় স্টিয়ারিং তুলে দিলেন ২৩ বছরের তরুণ হেলপার মো. বিল্লাল হোসেনের হাতে।

সেখান থেকে শুরু হলো আরেক রুদ্ধশ্বাস এবং ট্রাজিক অধ্যায়। হেলপার বিল্লাল স্টিয়ারিং ধরে চট্টগ্রামের পানে ছুটছেন। পাশে তখন কাতরাচ্ছেন তার ওস্তাদ।

কিন্তু ফেনীর মহিপাল এলাকায় পৌঁছানোর আগেই নিভে গেল চালক জামাল উদ্দিনের জীবনের প্রদীপ। পাশে বসা চালক তখন এক নিথর মরদেহ।

সেই মরদেহ কেবিনে নিয়ে, বুকভরা আতঙ্ক আর চোখভরা জল নিয়ে বিল্লাল একা চালিয়ে গেলেন আরও কয়েক দশ কিলোমিটার।

অবশেষে ট্রাকটি থামল মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানাধীন নাহার এগ্রো ফিড লিমিটেডের বিপরীতে ফারদিন পেট্রোল পাম্পের সামনে।

বিল্লাল তখন কাঁপছেন-ভয়ে নয়, এক অদ্ভুত শূন্যতায়। তিনি পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও পুলিশকে জানালেন মহাসড়কের সেই বিভীষিকার কথা।

এই ঘটনাটি মহাসড়কগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চপেটাঘাত। উজানিশার থেকে জোরারগঞ্জ-দীর্ঘ এই পথের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি।

এই দীর্ঘ পথে হাইওয়ে পুলিশের টহল কোথায় ছিল? একটি চলন্ত ট্রাকে ডাকাত দল ঢুকে চালককে কুপিয়ে মেরে ফেলল, অথচ পুরো পথটিতে কোনো চেকপোস্টে বা টহল দলের চোখে কেন এই রক্তাক্ত ট্রাকটি পড়ল না?

হাইওয়েতে সিসিটিভি ক্যামেরা আর কোটি কোটি টাকার আধুনিকায়ন তবে কার স্বার্থে?

খবর পেয়ে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতের মরদেহের সুরতহালসহ প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম শুরু করেছে।

জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল হালিম জানিয়েছেন, হেলপার বিল্লাল হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

নিহত চালক জামাল উদ্দিনের বাড়ি ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার উত্তর চর আইসা এলাকায়। তাঁর পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর থানাকেও অবহিত করা হয়েছে।

জামাল উদ্দিনের পরিবার আজ অভিভাবকহীন। ভোলার চরফ্যাশনের সেই প্রত্যন্ত গ্রামে এখন কেবলই কান্নার রোল। কিন্তু এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?

মহাসড়ক কি তবে রাতের অন্ধকারে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়েই থাকবে?

প্রশাসন তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ ও পরিবহন শ্রমিকদের দাবি-এই তদন্ত যেন ফাইলের নিচে চাপা না পড়ে।

উজানিশার ব্রিজের সেই খুনি ডাকাতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায়, আজ যিনি জামাল উদ্দিন, কাল তিনি অন্য কেউ হবেন। মহাসড়কে আর কোনো চালকের রক্তে যেন কোনো হেলপারকে একা স্টিয়ারিং ধরতে না হয়-এটাই এখন সময়ের জোরালো দাবি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি