চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম শীর্ষ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন)-এর কার্যালয়ে হানা দিয়ে চাঁদা দাবি, ভাঙচুর ও বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটের ঘটনায় জড়িত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও র্যাব-৭ এর এক যৌথ অভিযানে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাতভর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
বুধবার (১৫ জুলাই) সিএমপির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত প্রত্যেকেই চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত অপরাধী এবং তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ডাকাতি, মানবপাচার ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১১ জুলাই। দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে আসা ডিডিএন-এর স্বত্বাধিকারীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একটি অচেনা কল আসে।
ওপাশ থেকে নিজেকে ‘ডেবিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করে।
ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে প্রাণনাশ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
“হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবির ঠিক দুদিন পর, গত ১৩ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চকবাজার থানার মনুমিয়াজী লেইনের ‘মরিয়ম হাইটস’ ভবনের তৃতীয় তলায় ডিডিএনের প্রধান কার্যালয়ে নেমে আসে সেই হুমকির বাস্তব রূপ।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল পূর্বপরিকল্পিতভাবে অফিসে প্রবেশ করে। তারা ভেতরে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন ও আসবাবপত্রসহ প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, হামলাকারীরা কেবল ভাঙচুর করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং যাওয়ার সময় অফিস টেবিল থেকে নগদ ৪৭ হাজার টাকা, তিনটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন এবং একটি ক্যানন প্রিন্টার নিয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের ওপর। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য তার কাঁধের ব্যাগে রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা।
এ ঘটনায় চকবাজার থানায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ৪৪৮, ৪২৭, ৩৮৫, ৩৮০, ১০৯, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সরাসরি নির্দেশনায় চকবাজার থানা পুলিশ, সিএমপির বিশেষ টিম এবং র্যাব-৭ যৌথভাবে মাঠে নামে।
মঙ্গলবার রাতভর প্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর বিভিন্ন আস্তানায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন-মো. ইউনুস (৪১), ইমরান হোসেন চ্যাং (৩১), আকবর হোসেন (২৪), মো. সুমন (২৭), মো. মনির ওরফে কেহেরমান (৩৮), মো. গিয়াস উদ্দিন (২১), মো. নয়ন (২০) এবং মোহাম্মদ আবদুল নাহিদ ওরফে ফরহাদ (২৮)।
সিএমপির তথ্যমতে, গ্রেপ্তারদের মধ্যে মো. ইউনুসের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মানবপাচার, মাদক ও ছিনতাইয়ের ৫টি, ইমরান হোসেন চ্যাংয়ের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মারামারি, চোরাচালান ও দ্রুত বিচার আইনের ১২টি, আকবর হোসেনের বিরুদ্ধে ৬টি, মো. সুমনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, অস্ত্র ও মাদকসহ ৬টি, মো. মনির ওরফে কেহেরমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও মারামারির ৭টি এবং মো. নয়নের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও চুরির ৮টি মামলা রয়েছে।
চকবাজার থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ইতিমধ্যেই আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তবে ঘটনার মূল হোতা বা পর্দার আড়ালের ‘ডেবিড ইমন’-এর প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা এবং লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধারে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এই দুর্ধর্ষ চক্রের গ্রেপ্তারে নগরীর ব্যবসায়ীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, এ ধরনের পরিকল্পিত কর্পোরেট হামলার পেছনে আর কোনো বড় চক্র কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

