চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির পাহাড়ি ও সমতলের জনপদে এখন একটাই আলোচনা-‘কোথায় হবে নতুন ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সদরদপ্তর?’
সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আর সাধারণ মানুষের ভৌগোলিক বাস্তবতার দ্বন্দ্বে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এক নজিরবিহীন প্রতিবাদের সাক্ষী হলো এই জনপদ।
‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদ’ এর ডাকে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে পালিত হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত সকাল-সন্ধ্যা হরতাল।
বৃহস্পতিবার ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ছয়টা। শীতাতপ বা কুয়াশাভেজা ভোরের নীরবতা ভেঙে ফেনী-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ফেলাগাজী দিঘি-হেয়াঁকো সড়কে নেমে আসেন শত শত স্থানীয় বাসিন্দা।
সড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে এবং বিশাল গাছের গুঁড়ি ফেলে শুরু হয় বিক্ষোভ।
এর ফলে মুহূর্তের মধ্যেই স্থবির হয়ে পড়ে উত্তর চট্টগ্রামের অন্যতম ব্যস্ত এই লাইফলাইন।
নারায়ণহাট, দাঁতমারা, শান্তিরহাট, হেয়াঁকো, চিকনছড়া ও বাগানবাজার ইউনিয়নে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
মহাসড়কের দুই পাশে আটকা পড়ে বাস, ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ শত শত যানবাহন।
তবে জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান, ফার্মেসি, ক্লিনিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
গত ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় বহুল প্রতীক্ষিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার অনুমোদন দেওয়া হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে নতুন এই উপজেলার সদরদপ্তর নির্ধারণ করা হয় বর্তমান ভূজপুর থানা কার্যালয়–সংলগ্ন স্থানে।
আর এই সিদ্ধান্তের পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, ভূজপুর থানা এলাকায় সদরদপ্তর স্থাপন করা হলে তা ভৌগোলিক দিক থেকে প্রান্তিক মানুষের কোনো উপকারে আসবে না।
ভূজপুর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে, দাঁতমারা ও নারায়ণহাট ইউনিয়নের মধ্যবর্তী কোনো যৌক্তিক স্থানে সদরদপ্তর স্থানান্তরের দাবিতে অনড় তারা।
ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক নুরুল আমিন আজাদ জানান, “উত্তর উপজেলার সদরদপ্তর ন্যায্যতার ভিত্তিতে উত্তরাঞ্চলেই স্থাপন করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সাধারণ মানুষের সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উত্তরাঞ্চলের প্রায় আড়াই লাখ মানুষের প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করতে সদরদপ্তর আরও যৌক্তিক জায়গায় স্থাপন করতে হবে। দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
সকালে উপজেলার বালুটিলা, চিকনছড়া, গার্ডের দোকান, হেয়াঁকো, দাঁতমারা, শান্তিরহাট ও নারায়ণহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আন্দোলনকারীরা ব্যানার-ফেস্টুন হাতে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছেন রাজপথ।
যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও কৌশলগত স্থানে মোতায়েন রয়েছে ভূজপুর থানা–পুলিশের একাধিক দল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভূজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপুল চন্দ্র দে বলেন, “হরতালকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। তবে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে পুলিশ তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
আড়াই লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি আর সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এই টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

