পানির নিচে কৃষকের স্বপ্ন: ঘুরে দাঁড়াতে পাশে দাঁড়াচ্ছে সরকার

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০৪

টানা অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের ক্ষত এখনো দগদগে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদে। বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও রেখে গেছে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন।

মাঠের পর মাঠ তলিয়ে গেছে বীজতলা, ভেসে গেছে খামারির স্বপ্নের মাছ, আর খাদ্য ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকিতে পড়েছে লাখো গবাদিপশু।

এমন এক মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিপর্যস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জোরালো ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত পাঁচ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৩২৭ মেট্রিক টন ধানবীজ, এক লাখ ৫১ হাজার ৫৯৯টি গবাদিপশুকে টিকাদান এবং ৩৫ লাখ টাকার গোখাদ্য বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এই আশাপ্রদ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষয়ক্ষতি এবং বন্যা-পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

প্রাথমিক মাঠপর্যায়ের তথ্যের বরাত দিয়ে মন্ত্রী জানান, এবারের বন্যায় পাঁচ জেলায় মৎস্য খাতে ২০০ কোটিরও বেশি এবং প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৭৭ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

তবে এটিই শেষ নয়, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত ও নিখুঁত চিত্র নিরূপণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে এখনও তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।

বন্যায় কৃষকের প্রধান হাতিয়ার ‘বীজতলা’ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী জানান, পুনর্বাসনের জন্য ৩২৭ মেট্রিক টন ধানবীজ প্রয়োজন হবে এবং সরকারের কাছে এর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

তবে সরকার শুধু বীজ বিতরণেই ক্ষান্ত থাকছে না, নিয়েছে দূরদর্শী পদক্ষেপ।

যেসব কৃষকের জমি ইতিমধ্যে বীজ বপনের উপযোগী হয়েছে, তাদের কাছে এখনই বীজ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

যাদের জমি এখনও প্রস্তুত হয়নি, তাদের জন্য সরকারি খালি জমিতে জরুরি ভিত্তিতে বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সেখান থেকে ধানের চারা সংগ্রহ করে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, “ক্ষতিগ্রস্ত কোনো কৃষক বা খামারি যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।”

বলেন, বন্যা পরিস্থিতি বিদায় নিলেও গবাদিপশুর মধ্যে ‘খুরা রোগ’সহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।

একই সাথে নষ্ট হয়ে গেছে মাঠের খড় ও পশুখাদ্য। বোবা প্রাণীদের এই স্বাস্থ্য ও খাদ্যঝুঁকি মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী জানান, আগামীকাল (শুক্রবার) থেকেই পাঁচ জেলার ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৯৯টি গবাদিপশুকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে, যা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া, প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া ৩৫ লাখ টাকার গোখাদ্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে দ্রুত বণ্টন করা হবে।

প্রয়োজনভেদে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সে জন্য সরকার ইউনিয়নভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে।

যেখানে ক্ষতির তীব্রতা বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. বয়জার রহমান এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

তারা সকলেই মাঠপর্যায়ে দ্রুত এই সহায়তা পৌঁছে দিতে একযোগে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছে সাময়িক হার মানলেও, সরকারের এই সমন্বিত ও দ্রুত উদ্যোগ চট্টগ্রামের বানভাসি প্রান্তিক চাষি ও খামারিদের আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি