কারখানায় শিশু, আইসক্রিমে বিষ—চট্টগ্রামে ভয়ংকর চিত্র!

প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল, ২০২৬ ১৯:২৬

চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর থানাধীন ঈশান মিস্ত্রী হাট এলাকার একটি খালপাড় ঘিরে গড়ে উঠেছে অবৈধ দুইটি আইসক্রিম কারখানা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে বছরের পর বছর ধরে চলছে কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে আইসক্রিম ও খাদ্য উৎপাদন।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্য ও স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে এসেছে শিশু শ্রম, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং তদারকি সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তার এক উদ্বেগজনক চিত্র।

জানা গেছে, কারখানা দুটি পরিচালনা করেন হারুন ও মিজান নামে দুই ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, দুজনের অনুমোদনহীন কারখানায় আইসক্রীম উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে ময়লাযুক্ত পানি, নিম্নমানের চিনি (স্থানীয়ভাবে ‘গণচিনি’ নামে পরিচিত), অজানা উৎসের রং ও বিষাক্ত রাসায়নিক।

এসব উপাদান ব্যবহার করে তৈরি আইসক্রিম বিভিন্ন দোকান, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সামনে বিক্রি করা হচ্ছে—যেখানে প্রধান ক্রেতা শিশু-কিশোররা। কারখানা দুটিতে কাজ করছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা—এমন অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোট ছোট শিশুরাই উৎপাদন, প্যাকেজিং এবং সরবরাহ কাজে যুক্ত। শিশু শ্রম আইন এখানে কার্যত অকার্যকর বলেই মনে করছেন তারা।

তথ্যানুসারে, দুটি কারখানা থেকে প্রায় ২০টি ভ্যানগাড়ির মাধ্যমে প্রতিদিন অন্তত ২ লাখ পিস আইসক্রিম উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে উৎপাদনকৃত আইসক্রীমগুলোর রঙচোঙা প্যাকেটজাতে নামকরণও করা হয়েছে।

এরমধ্যে রয়েছে ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চি সব মালাই আইসক্রিম’, ‘স্ট্রবেরি আইসক্রিম’, ‘স্বাদ ললি আইসক্রিম’ এবং ‘স্বাদ চকবার আইসক্রিম। পলিথিন প্যাকেটে বাজারজাত করা এসব পণ্যের দাম ৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অননুমোদিত পরিবেশে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি খাদ্যপণ্য, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।

কাগজপত্রে অনীহা, অভিযোগ ঘুষের
স্থানীয়দের বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে কারখানা দুটিতে সরেজমিনে গিয়ে দুই সত্তাধিকারীর সাথে কথা বলেন প্রতিবেদক। বিপুল আয়ের পরও কেন তারা সরকারি কাগজপত্র নিচ্ছেন না—এ প্রশ্নে হারুন ও মিজানের দাবি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ঘুষের বিনিময়ে নীরব থাকে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসটিআই, ফায়ার সার্ভিস এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নিয়মিত ‘ম্যানেজ’ থাকেন।

স্থানীয় সূত্র বলছে, আগে বিএসটিআইয়ের মোস্তাক নামে এক ব্যক্তি নিয়মিত মাসোহারা নিতেন, বর্তমানে তার স্থলে মনতোষ বড়ুয়া দায়িত্বে রয়েছেন। একইভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক দারোয়ানও নিয়মিত অর্থ নেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।

এদিকে বন্দর থানার ওসি এবং থানার কিছু সদস্য অবৈধ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পন্ন আইসক্রীম কারখানা দুটো থেকে নিয়মিত চাঁদা পান—এমন দাবিও করেছেন কারখানার মালিকরা নিজেদের কথোপকথনে। স্থানীয়ভাবে আবেদ নামে এক ক্যাশিয়ার ওসির জন্য চাঁদা সংগ্রহ করেন বলেও জানা গেছে।

ফলে এত অভিযোগ ও অনিয়মের পরও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

তাদের দাবি, দ্রুত এসব কারখানার বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে শিশু শ্রম বন্ধ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা জরুরি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি