চসিকে সিইও সরলেন, নতুন কেউ এলেন না-১০ মাসেও সমাধান নেই!

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ১৯:২২

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদটি প্রায় ১০ মাস ধরে শূন্য।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক এই পদে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় দাপ্তরিক কার্যক্রম, সেবা প্রদান এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

যদিও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দাবি করছেন, কোনো ফাইল আটকে নেই এবং স্বাভাবিক নিয়মেই কাজ চলছে; তবে ভেতরে-বাইরে আলোচনা থামছে না।

বর্তমানে চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে তিনি সচিব এবং সিইও—দুই গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলাচ্ছেন।

প্রশাসনিক মহলের মতে, একটি বৃহৎ সিটি করপোরেশনে এই দুই পদই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বের পরিধিও ব্যাপক।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে একজন কর্মকর্তার হাতে দুই পদের দায়িত্ব থাকাটা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

যেভাবে শুরু হয় শূন্যতা:
জানা যায়, গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর উচ্চতর প্রশিক্ষণে অংশ নিতে ছুটিতে যান চসিকের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

প্রশিক্ষণকালীন সময়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সিইওর দায়িত্ব দেওয়া হয় সচিব মো. আশরাফুল আমিনকে।

প্রশিক্ষণ শেষে ২৩ অক্টোবর কর্মস্থলে যোগ দিতে এলেও তৌহিদুল ইসলামের যোগদানপত্র গ্রহণ করেননি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এর আগে ও পরে বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেয়র ও সিইওর মধ্যে দূরত্ব প্রকাশ্যে চলে আসে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ৩০ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক ডিও লেটারে তৌহিদুল ইসলামকে বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন মেয়র।

সেখানে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং দুদকের তদন্তের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল।

মেয়রের ভাষ্য ছিল, এসব কারণে চসিকের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমও প্রভাবিত হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রশিক্ষণ শেষে যোগদান করতে না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ৩০ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে নিজের অবস্থান জানান তৌহিদুল ইসলাম। পরবর্তীতে বিষয়টি তদন্তে দুই সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়।

বদলি হলো, কিন্তু এলেন না নতুন সিইও :
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর গত বছরের ১৭ নভেম্বর শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছিল।

তবে তার স্থলে নতুন কোনো প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি। ফলে সেই থেকে আজ পর্যন্ত অতিরিক্ত দায়িত্বেই চলছে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর।

প্রশ্ন উঠেছে, যদি একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এতটাই জরুরি হয়ে থাকে, তাহলে প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলো না কেন?

ফাইল আটকে থাকার অভিযোগ, সেবায় ধীরগতির আলোচনা:
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চসিকের একাধিক কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেছেন, একই ব্যক্তির হাতে দুই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে বলেও দাবি তাদের।

তাদের ভাষ্য, সচিব ও সিইও—দুই পদই পূর্ণকালীন মনোযোগ দাবি করে। একটির দায়িত্ব পালনের সময় অন্যটি স্বাভাবিকভাবেই চাপের মুখে পড়ে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন মো. আশরাফুল আমিন।

তিনি বলেন, “একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করতে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমার টেবিলে কোনো ফাইল আটকে থাকে না।

অফিসের কাজে ঢাকায় গেলেও সেদিনই ফিরে আসি। সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফাইল নিষ্পত্তি করা হয়। ফাইল আটকে থাকার অভিযোগ সত্য নয়।”

প্রশাসনিক বাস্তবতা কী বলছে?
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা একটি সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক মেরুদণ্ড। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জনবল নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার কার্যক্রম, নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই পদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

অন্যদিকে সচিব পদও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বোর্ড সভার কার্যক্রম, প্রশাসনিক সমন্বয়, নথিপত্র ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক বিষয় তদারকির দায়িত্ব থাকে এই পদে।

ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একজন কর্মকর্তার হাতে দুই পদ থাকলে প্রশাসনিক চাপ বাড়া স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য:
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন শাখা-১ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম বলেছেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ চালানো হলে কিছু দাপ্তরিক অসুবিধা হওয়া স্বাভাবিক।

তবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদায়নের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত।

তিনি জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে কর্মকর্তা দেওয়া হলে তাদের কোনো আপত্তি নেই।

অন্যদিকে এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাগরিকদের প্রশ্ন, কবে মিলবে স্থায়ী সমাধান?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন দেশের বৃহৎ নগর প্রশাসনগুলোর একটি। প্রতিদিন হাজারো নাগরিক বিভিন্ন সেবা নিতে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রশাসনিক শীর্ষ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করা।

আর সেই লক্ষ্য পূরণে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

প্রায় এক বছর হতে চললেও চসিক এখনো একজন পূর্ণাঙ্গ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পায়নি।

ফলে প্রশ্নটি এখন আরও জোরালো—চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিকে আর কতদিন অতিরিক্ত দায়িত্বের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি