জেনারেল হাসপাতাল ঘিরে অভিযোগের পাহাড়: টেন্ডার থেকে বিল, সবখানেই প্রশ্ন

সুবিধাভোগী এক মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান!

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:৩২

৯ কোটি ২১ লাখ টাকার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনায় এক মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযোগ্য ঘোষণার অভিযোগ, কম দরদাতাকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন, সব পণ্য বুঝে পাওয়ার প্রত্যয়ন দিয়ে বিল পরিশোধের পরও সরবরাহের অভিযোগ। অভিযোগ পৌঁছেছে দুদক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সরকারি হাসপাতালের সকল টেন্ডারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রোগীর জীবন, চিকিৎসকের হাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছানোর নিশ্চয়তা এবং করদাতার অর্থের জবাবদিহি।

তাই সরকারি কেনাকাটার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি জনস্বার্থেরও অপরিহার্য শর্ত।

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার টেন্ডার ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলো সেই স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে টেন্ডার মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা, বিল পরিশোধের সময় এবং পণ্য সরবরাহের প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য গত জানুয়ারিতে ১৪টি পৃথক আইটেমে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনার দরপত্র আহ্বান করে আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল।

ধাপে ধাপে মূল্যায়ন শেষে গত ১৫ এপ্রিল সাতটি, ৬ মে একটি, ৭ মে দুটি, ১৭ মে একটি এবং ১৯ মে তিনটি কার্যাদেশের চুক্তি সম্পন্ন হয়। সব মিলিয়ে এসব চুক্তির আর্থিক মূল্য ৯ কোটি ২১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৬ টাকা।

এই মোট বরাদ্দের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ—৭ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৬ টাকার ছয়টি কার্যাদেশ—পায় ‘এমএসএম হেলথ কেয়ার’ ও ‘এমএসএম বাংলাদেশ’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, প্রতিষ্ঠান দুটি একই মালিকানাধীন। দুটির কর্ণধার রুমানা সুলতানা মৌ। তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে গিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে টেন্ডারসংক্রান্ত নথি, বিল অনুমোদনের কাগজপত্র, ডেলিভারি চালান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।

পাশাপাশি অভিযোগকারী ঠিকাদার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অভিযোগগুলোর কয়েকটি বিষয়ে নথিতে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার মতো তথ্য রয়েছে। আবার কয়েকটি বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে বিষয়গুলো এখন তদন্তের দাবি রাখে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে দুই প্রতিষ্ঠান:
টেন্ডারসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, মোট ১৪টি আইটেমের মধ্যে ছয়টি কার্যাদেশ পেয়েছে ‘এমএসএম হেলথ কেয়ার’ ও ‘এমএসএম বাংলাদেশ’। আর্থিক মূল্যে এই ছয়টি কার্যাদেশের পরিমাণ ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৬ টাকা, যা মোট চুক্তিমূল্যের প্রায় ৮২ শতাংশ।

একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, এত বড় অংশের কাজ একই মালিকানার দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার প্রশ্ন তোলে। তাঁদের দাবি, টেন্ডার মূল্যায়নের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে।

এ নিয়ে বেশ কয়েকজন ঠিকাদার আলাদাভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারি কয়েকটি দপ্তরে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।

মেসার্স জম জম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দিদারুল আলম অভিযোগ করেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করা হলেও কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা জানতে লিখিত আবেদন করার পরও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

তাঁর ভাষ্য, পরবর্তীতে দ্রুততার সঙ্গে এমএসএম বাংলাদেশ ও এমএসএম হেলথ কেয়ারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

দিদারুল আলমের দাবি, টেন্ডারে যেসব অভিজ্ঞতার শর্ত উল্লেখ ছিল, অভিযোগ অনুযায়ী তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ছিল না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ঠিকাদারি করার অভিজ্ঞতায় তিনি এর আগে প্রতিষ্ঠান দুটিকে বড় সরকারি কাজ করতে দেখেননি।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মেসার্স এম রহমান অ্যান্ড কোংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. নাছির উদ্দিন চৌধুরী, মেসার্স সাদমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ আবু তালেব এবং মেসার্স কাশেম অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী এম এ কাশেম। তাঁরা পৃথকভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

অভিযোগপত্রে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসাইন, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন খালেদ এবং স্টোরকিপার শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগে আরও একজন ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) নেতা এবং একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগের তথ্য যাচাই করলেও বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবস্থান ভিন্ন। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসাইন বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ পান না। তাঁর ভাষ্য, টেন্ডার মূল্যায়নের জন্য পৃথক কমিটি রয়েছে এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর অ্যাকাউন্টস শাখা, স্টোর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের সবাই জানিয়েছেন, টেন্ডারের পণ্য হাসপাতালের স্টোরে পৌঁছেছে।

বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে তিনি একটি পৃথক কমিটি গঠন করেছেন এবং সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে সামনে আসে টেন্ডার মূল্যায়নের আরও কিছু অসঙ্গতির অভিযোগ। নথিপত্রে দেখা যায়, অন্তত একটি টেন্ডারে কম দরপ্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পায়নি, আবার অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এক টেন্ডারে ‘নন-রেসপনসিভ’ এবং অন্য টেন্ডারে ‘রেসপনসিভ’ হিসেবে মূল্যায়নের তথ্য রয়েছে। এই বিষয়গুলোই টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নথিতে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে:
অভিযোগকারীদের বক্তব্যের বাইরে টেন্ডার–সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায়ও কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে, যেগুলো টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বিশেষ করে একই ধরনের যোগ্যতার মূল্যায়নে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত, কম দরদাতাকে কার্যাদেশ না দেওয়া এবং পরিশোধ–সরবরাহের সময়ক্রম নিয়ে নথিতে দেখা তথ্যগুলো এখন তদন্তের দাবি রাখে।

এক টেন্ডারে অযোগ্য, অন্য টেন্ডারে যোগ্য:
হাতে আসা টেন্ডার মূল্যায়নের নথি অনুযায়ী, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহের (টেন্ডার আইডি–১২০৬০৭২) ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান আলী অ্যাসোসিয়েটসকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ মূল্যায়ন কমিটির বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটি ওই টেন্ডারের শর্ত পূরণ করেনি।

কিন্তু একই সময়ের আরেকটি টেন্ডারে—আসবাবপত্র সরবরাহের (টেন্ডার আইডি–১২০৬০৭৩)—সেই আলী অ্যাসোসিয়েটসকেই ‘রেসপনসিভ’ বিবেচনা করে ২৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৫৯ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

এই দুই মূল্যায়নের মধ্যে কী পরিবর্তন হয়েছিল, কিংবা কোন নথির ভিত্তিতে এক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি অযোগ্য এবং অন্য ক্ষেত্রে যোগ্য বিবেচিত হলো—এ বিষয়ে টেন্ডার নথিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগকারী ঠিকাদারদের প্রশ্ন, যদি কোনো মৌলিক যোগ্যতা বা নথির ঘাটতির কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের দরপ্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে একই সময়ের আরেকটি টেন্ডারে সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে গ্রহণযোগ্য হলো? নাকি দুই মূল্যায়নে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে?

কম দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ:
সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহের একই টেন্ডারকে কেন্দ্র করে আরেকটি অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার মূল্যায়নের নথি অনুযায়ী, মেসার্স আলমগীর অ্যান্ড ব্রাদার্স এক কোটি ৮৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকার দরপ্রস্তাব দেয় এবং আর্থিক মূল্যায়নে অংশ নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ পায়নি।

পরিবর্তে প্রায় ১৭ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৪ টাকা বেশি মূল্যে দুই কোটি ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭৬ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় এমএসএম হেলথ কেয়ারকে।

সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী শুধু কম দরদাতা হলেই কার্যাদেশ পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না, কারিগরি যোগ্যতা, শর্ত পূরণ এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এই ক্ষেত্রে কেন কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হলো, সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ব্যাখ্যা নথিতে স্পষ্ট নয়। এ কারণেই তারা বিষয়টিকে নিরপেক্ষভাবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।

অভিজ্ঞতার প্রশ্ন:
অভিযোগকারীদের আরেকটি বড় অভিযোগ, এমএসএম হেলথ কেয়ার ও এমএসএম বাংলাদেশের টেন্ডারে চাওয়া অভিজ্ঞতা ছিল না।

মেসার্স জম জম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দিদারুল আলম দাবি করেন, টেন্ডারে নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণের মতো পূর্ববর্তী কাজ প্রতিষ্ঠান দুটির ছিল না।

তাঁর ভাষ্য, বহু বছর সরকারি কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি এর আগে প্রতিষ্ঠান দুটিকে এত বড় অঙ্কের কাজ করতে দেখেননি।

অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, সব দরপত্র মূল্যায়ন করেছে নির্ধারিত কমিটি এবং সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ পৌঁছায় দুদক ও মন্ত্রণালয়ে:
টেন্ডারপ্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে একাধিক ঠিকাদার পৃথকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।

অভিযোগে টেন্ডার মূল্যায়ন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তোলা হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানান, অভিযোগটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হাসপাতাল অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কোনো অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিল আগে, সরবরাহ পরে?
টেন্ডার মূল্যায়নের অভিযোগের বাইরে অনুসন্ধানে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হয়ে ওঠে বিল অনুমোদন ও পণ্য সরবরাহের সময়ক্রম।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সব ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বুঝে পাওয়ার প্রত্যয়ন দিয়ে ঠিকাদারদের বিল বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠায়।

নথি অনুযায়ী, ২২ জুন বিল অনুমোদিত হয় এবং আইবাস (Integrated Budget and Accounting System)–এর মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

কিন্তু এর পরদিন, ২৩ জুন, জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে উপস্থিত প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই দিন দুপুরে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি পিকআপভ্যানে ওষুধ হাসপাতালে আনা হয়।

ওই সময় ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র সুপারভাইজর প্রণব কুমার নাথ বলেন, ঢাকা থেকে ওষুধ এসেছে এবং সেদিনই তা হাসপাতালে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ডেলিভারি চালানে যা দেখা গেছে:
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের তিনটি ডেলিভারি চালান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চালানগুলো ১৬, ১৮ ও ২০ জুন ইস্যু করা হলেও হাসপাতালের স্টোরকিপারের গ্রহণ–স্বাক্ষর রয়েছে ২৩ জুন তারিখে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, যদি ২২ জুনের আগেই সব পণ্য গ্রহণ করা হয়ে থাকে এবং সেই ভিত্তিতে বিল অনুমোদনের জন্য প্রত্যয়ন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ২৩ জুন আবার একই টেন্ডারের ওষুধ গ্রহণের প্রয়োজন কেন হলো?

তাঁদের মতে, এই সময়ক্রম বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে এবং বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা:
এমএসএম হেলথ কেয়ার ও এমএসএম বাংলাদেশের কর্ণধার রুমানা সুলতানা মৌ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, বিলের অর্থ অনুমোদনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আইবাসে সম্পন্ন হলেও তা সঙ্গে সঙ্গে হিসাবে জমা হয় না। তাঁর ভাষ্য, তিনি নির্ধারিত সময়েই বিলের অর্থ পেয়েছেন।

সব পণ্য সরবরাহ না করেই বিল নেওয়ার অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। তাঁর দাবি, কার্যাদেশ অনুযায়ী সব পণ্য ১৪ জুনের মধ্যেই হাসপাতালে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

২৩ জুন ওষুধ সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, ইনসেপ্টার একটি ভ্যাকসিনের লেবেলিং–সংক্রান্ত কারণে সেটি পরে সরবরাহ করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি পুরো চালানের বিলম্ব নয়; নির্দিষ্ট একটি পণ্যের সরবরাহসংক্রান্ত বিষয়।

অন্যদিকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দাবি, অভিযোগ ওঠার পর তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্টোর শাখার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী সব পণ্য স্টোরে পৌঁছেছে। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে তিনি একটি পৃথক কমিটি গঠন করেছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে অভিযোগকারী ঠিকাদারদের বক্তব্য, এই ব্যাখ্যাগুলো নথিতে দেখা সময়ক্রম ও ডেলিভারি চালানের তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য :
টেন্ডারপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, বিল পরিশোধ এবং পণ্য সরবরাহসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. একরাম হোসেন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, টেন্ডার মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত একটি কমিটি রয়েছে। সেই কমিটি কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করে সুপারিশ দেওয়ার পরই কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ বা এখতিয়ার রাখেন না বলেও দাবি করেন।

বিল অনুমোদনের পরও পণ্য সরবরাহের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগ ওঠার পর অ্যাকাউন্টস শাখা, স্টোর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, কার্যাদেশের আওতাধীন পণ্য হাসপাতালের স্টোরে পৌঁছেছে। বিষয়টি আরও নিশ্চিত করতে একটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন খালেদ এবং স্টোরকিপার শহীদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কাছ থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তথ্য সূত্র-জাগোনিউজ

অন্যদিকে, এমএসএম হেলথ কেয়ার ও এমএসএম বাংলাদেশের কর্ণধার রুমানা সুলতানা মৌ অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া সরকারি বিধি অনুসারেই সম্পন্ন হয়েছে।

তাঁর দাবি, কার্যাদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে এবং বিল পরিশোধের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও সরকারি নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।

নির্দিষ্ট একটি ভ্যাকসিনের লেবেলিং–সংক্রান্ত কারণে পরে সরবরাহের বিষয়টি ঘটেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ:
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটা নিয়ে যেকোনো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের একমাত্র উপায় হলো স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।

তিনি বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে শুধু আইনগত বৈধতা নয়, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধ এবং পণ্য গ্রহণ—প্রতিটি ধাপে যদি প্রশ্ন ওঠে, তবে তা জনআস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।

সরকারি হাসপাতালের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটা কেবল প্রশাসনিক একটি কার্যক্রম নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য অপরিহার্য।

এই অনুসন্ধানে পর্যালোচিত নথি, অভিযোগকারী ঠিকাদারদের বক্তব্য এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় কয়েকটি বিষয়ে ভিন্নমত স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে টেন্ডার মূল্যায়নের পদ্ধতি, কিছু প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নির্ধারণ, কম দরদাতাকে কার্যাদেশ না দেওয়া এবং বিল অনুমোদন ও পণ্য সরবরাহের সময়ক্রম—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান এক নয়।

এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর কেবল একটি স্বাধীন ও নথিভিত্তিক প্রশাসনিক বা আইনগত তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।

টেন্ডারপ্রক্রিয়া নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোর সত্যতা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে পর্যালোচিত নথি, অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং তা যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থের প্রতিটি ব্যয় শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ। সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, টেন্ডার মূল্যায়ন কতটা স্বচ্ছ, কার্যাদেশ বিধিমালা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে কি না এবং বিল পরিশোধের আগে সরকারি শর্ত যথাযথভাবে পূরণ হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর পাওয়া জনস্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে যে সিদ্ধান্তই আসুক, তা দ্রুত, স্বচ্ছ এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে একদিকে যেমন অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষই ন্যায়বিচারের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে সরকারি কেনাকাটা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাও শক্তিশালী হবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি