প্রলয় চৌধুরী মুক্তি : দিনশেষে সূর্যটা যখন করলডেঙ্গা কিংবা জ্যৈষ্টপুরার পাহাড়ে মুখ লুকায়, ঠিক তখনই এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে বোয়ালখালীর পূর্বাঞ্চলের জনপদকে।
পাহাড়ের কোলঘেঁষা এই লোকালয়গুলোতে এখন স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ হারিয়ে গেছে।
গত কয়েকদিন ধরে দলবেঁধে বন্য হাতির বিচরণ চলায় স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। হাতির হানার ভয়ে ফসলের মাঠে গিয়ে নিয়মিত চাষাবাদ করতেও সাহস পাচ্ছেন না স্থানীয় চাষিরা।
বলা চলে, বনের হাতি এখন আর শুধু বনেই সীমাবদ্ধ নেই। খাদ্যের সন্ধানে তারা হানা দিচ্ছে মানুষের ঘরের দুয়ারে।
গত শনিবার উপজেলার জ্যৈষ্টপুরা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলমের বসতভিটায় আক্রমন করে একদল বন্য হাতি।
হাতির দলটি পাকা দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে কাঁঠাল বাগানসহ নানাবিধ ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে।
ক্ষতির এই তালিকা দিন দিন দীর্ঘই হচ্ছে। এর আগের দিন ওই এলাকার ব্রাহ্মণ বিলে কৃষক নিমাই দে’র চাষাবাদের পানির স্কিমের পাইপ ভেঙে চুরমার করে দেয় হাতির দল।
নিমাই দে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “হাতি শুধু ফসল নষ্ট করছে না, আমাদের বেঁচে থাকার সম্বলগুলোও কেড়ে নিচ্ছে।”
এছাড়া আবু সুফিয়ান নামের অপর এক বাসিন্দার কাঁঠাল বাগানেরও ব্যাপক ক্ষতি করেছে বন্য হাতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার জ্যৈষ্টপুরা, আমুচিয়া ও করলডেঙ্গা পাহাড়ি এলাকায় হাতির দল প্রতিনিয়ত হানা দিচ্ছে।
দিনের বেলা হাতিগুলো পাহাড়ের গহীন অরণ্যে লুকিয়ে থাকলেও, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই নেমে আসে লোকালয় ও ফসলি জমিতে।
ফলে সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাসান চৌধুরী পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “হাতির দল শুধু ফসলের ক্ষতিই করছে না, বরং বসতবাড়ি ও ফলদ বাগানেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করছে।
হাতির আক্রমণের ভয়ে অনেক কৃষক ক্ষেতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এভাবে হাতির ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করলে এলাকায় চাষাবাদ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
পরিবেশবিদ ও বন কর্মকর্তাদের মতে, এর পেছনে রয়েছে মানুষেরই তৈরি করা এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। নির্বিচারে বন উজাড় ও হাতির চারণভূমি ধ্বংস করার কারণেই আজ বন্য প্রাণীরা লোকালয়ে হানা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা এমদাদুল হক এই সংকটের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “পাহাড়ে যখন খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দেয়, তখনই বন্য হাতিগুলো লোকালয়ে প্রবেশ করে। নির্বিচারে বন উজাড় করার কারণে হাতিগুলো প্রতিনিয়ত লোকালয়ে ঢুকে খাদ্যের অনুসন্ধান করছে।
তবে জনগণের জানমালের যাতে বড় কোনো ক্ষতি না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সচেষ্ট আছি। পাশাপাশি বন্য হাতিগুলোও যাতে সুরক্ষিত থাকে, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ ও সহনশীল থাকতে হবে।”
বন বিভাগ থেকে আরও জানানো হয়েছে, যে সকল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নিয়ম মেনে আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন, তাদের সরকারি বিধি মোতাবেক যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে।
হাতি ও মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বের লড়াই থামাতে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছেন বোয়ালখালীবাসী।
পাহাড় ও লোকালয়, উভয়কেই নিরাপদ রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

