রাঙামাটিতে বৃষ্টির তোড়ে বিপন্ন জনপদ: মাটি ও বিদ্যুৎ কেড়ে নিল দুই প্রাণ

প্রকাশিত: ০৭ জুলাই, ২০২৬ ১৭:১৬

টানা দুদিনের বর্ষণ শেষে আজ তৃতীয় দিনের মতো আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে রাঙামাটিতে। মেঘের এই লাগাতার বর্ষণে পাহাড়ি এই জনপদে এখন উৎসবের আমেজ নেই, আছে কেবল এক রুদ্ধশ্বাস আতঙ্ক।

বৃষ্টির তোড়ে নরম হয়ে আসা মাটির চাদর কখন ধসে পড়বে, এই শঙ্কায় দিন কাটছে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা হাজারো মানুষের।

এরই মধ্যে জেলাজুড়ে নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়। পৃথক দুটি মর্মান্তিক ঘটনায় ঝরে গেছে দুটি তাজা প্রাণ।

মঙ্গলবার সকালটা রাঙামাটির মানুষের জন্য কোনো ভালো বার্তা নিয়ে আসেনি। কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম লাল্যাঘোনা এলাকার পাহাড়ের মাটি এমনিতেই নরম হয়েছিল।

দুপুরে হঠাৎ পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ লক্ষী বিলাস চাকমার ওপর। মুহূর্তেই মাটিচাপা পড়েন তিনি।

স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করলেও ততক্ষণে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন এই স্থায়ী বাসিন্দা। বৃদ্ধের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে লংগদু উপজেলার মহাজনপাড়া এলাকায় ঘটেছে আরেক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

সকাল ১১টার দিকে নিজ বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইনে কাজ করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন দিনমজুর বেনসন চাকমা (৩০) ওরফে বদক্যা চাকমা।

নীল কান্তি চাকমার এই তরুণ ছেলেটি পরিবারের হাল ধরতে দিনরাত পরিশ্রম করতেন। কিন্তু একটি মুহূর্তের অসতর্কতা কেড়ে নিল তার প্রাণ।

লংগদু থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাকারিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ বিষয়টি অবগত রয়েছে এবং একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে।

এছাড়াও জেলা সদরের শিমুলতলী এলাকায় একটি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের দ্রুত তৎপরতায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সেখান থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রাঙামাটির মানুষের মনে এখনো দগদগে ঘা হয়ে আছে ২০১৭ সালের সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসের স্মৃতি। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জেলা প্রশাসন।

বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করতে জেলায় ইতোমধ্যে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি জানান, “বৈরী আবহাওয়া ও যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে সকাল থেকেই মাঠে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।”

প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে অবস্থান না করার এবং বৈদ্যুতিক লাইনে কাজ করার সময় দক্ষ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

গত রোববার থেকেই রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। শহরের এমন ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।

মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউটের সদস্যরা।

কাউখালী ও কাপ্তাই উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকেও মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

তবে প্রশাসনের এত প্রস্তুতির পরও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের আসার গতি এখনো কিছুটা ধীর। চিরচেনা ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসার এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে পাহাড়ের বাসিন্দাদের মনে। অবশ্য দুপুরের পর থেকে আশ্রয়কেন্দ্রমুখী মানুষের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটি শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে ২১টি পরিবারের প্রায় ৭০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

অন্যদিকে, কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া আরটিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে আরও ২০টি পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুরা।

আকাশের মেঘ এখনো কাটেনি, আর তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাঙামাটির মানুষের উদ্বেগ। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে এখন কেবলই টিকে থাকার লড়াই।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি