সময়টা ১৯৮১ সালের ৩০ মে। ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের নিস্তব্ধতা ভেঙে গর্জে উঠেছিল স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
সেই ইতিহাসের অন্যতম কৃষ্ণতম অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি নাম-মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) মো. মোজাফফর হোসেন।
যিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অবশেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) একটি সফল অভিযানে অবসান ঘটল তাঁর সাড়ে চার দশকের পলাতক জীবনের।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী ডিওএইচএস থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও কোর্ট মার্শালের জন্য তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল মোজাফফরকে। বনানী ডিওএইচএস এলাকায় তাঁর উপস্থিতির অকাট্য তথ্য পাওয়ার পরপরই বুধবার গভীর রাতে সেখানে বিশেষ অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ।
কোনো প্রকার প্রতিরোধের সুযোগ না দিয়েই তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এই খবর নিশ্চিত করে বলেন, “সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন মোজাফফর হোসেন।
যেহেতু তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য, তাই আটকের পরপরই বিষয়টি সেনাবাহিনীকে অবহিত করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন তারা এ ব্যাপারে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
সার্কিট হাউসের সেই ভয়াল ভোর: কী করেছিলেন মোজাফফর?
হত্যাকাণ্ডের পর দায়ের হওয়া মামলার বিবরণী ঘেঁটে জানা যায়, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্যতম কুশীলব ছিলেন এই মেজর মোজাফফর হোসেন এবং ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন।
৩০ মে ভোরে হামলাকারীরা যখন সার্কিট হাউসে তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন সবার আগে জিয়াউর রহমানকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করেছিলেন মেজর মোজাফফর।
শুধু শনাক্ত করাই নয়, ঠান্ডা মাথায় জিয়াউর রহমানের ওপর প্রথম গুলিটি চালিয়েছিলেন তিনিই।
হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পরপরই মোজাফফর টেলিফোনে তৎকালীন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে বিষয়টি জানান এবং মিশন সফল হওয়ার বার্তা দেন।
৪৫ বছরের ছদ্মবেশ ও সীমান্ত পারাপার
ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ত দাগ কেটে সেদিন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন মোজাফফর হোসেন। হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে একে একে ধরা পড়েন অন্য জড়িতরা।
গ্রেপ্তার হন ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন, যাঁর পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। গ্রেপ্তার হন মূল পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরও, যিনি পরবর্তীতে নিহত হন।
কিন্তু সুচতুর মোজাফফর হোসেন এবং অন্য আরেক আসামি মেজর এস এম খালেদ সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে সক্ষম হন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ এই ৪৫ বছর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মনামে আত্মগোপন করেছিলেন মোজাফফর।
প্রায়শই পরিচয় গোপন করে, ভুয়া নথি ব্যবহার করে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশেও আসতেন।
কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হয়নি। ৪৫ বছর ধরে যে রহস্যের জট পাকিয়েছিলেন তিনি, ঢাকার এক মধ্যরাতেই তার যবনিকা টানল ডিবি পুলিশ।
আইনের হাত থেকে যে কেউ চিরকাল রেহাই পায় না-মেজর মোজাফফরের এই পতন যেন আবারও সেই ধ্রুব সত্যকেই প্রমাণ করল।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


