পানি দুই ফুট, দুর্নীতি হাজার ফুট!

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬ ২১:০৪

মাত্র কয়েক ঘণ্টার মুষলধারে বৃষ্টি। তাতেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের জানআলী হাট ও ষোলশহর স্টেশনের মধ্যবর্তী প্রায় ৫০০ মিটার এলাকা চলে গেল অন্তত দুই ফুট পানির নিচে।

থমকে গেল দুই ট্রেনের চাকা, মাঝপথে আটকা পড়লেন শত শত যাত্রী। আপাতদৃষ্টিতে একে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বা অতিবৃষ্টি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পরিবেশবিদ ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের আঙুল কিন্তু অন্যদিকে।

তাঁদের পরিষ্কার বক্তব্য-এটি কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং রেলওয়ের অসাধু সিন্ডিকেটের ‘অপরিকল্পিত নকশা’ ও ‘পকেট ভারী করার’ এক বিষাক্ত ফল।

গত ৭ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন বন্ধ রাখতে হয়েছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই রুটের ট্রেন চলাচল।

চট্টগ্রামের রেল স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার নিশ্চিত করেছেন, নিয়ম অনুযায়ী রেললাইনের ওপর চার ইঞ্চি পর্যন্ত পানি উঠলেও ট্রেন চালানো সম্ভব। কিন্তু এখানে ট্র্যাক ডুবেছিল দুই ফুট পানির নিচে।

১২ জুলাই ‘অ্যাডভান্সড পাইলটিং’ বা সীমিত গতিতে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-নতুন নির্মিত একটি মেগা রেললাইন কেন সামান্য বৃষ্টিতেই সুইমিং পুলে পরিণত হলো?

“রেললাইনটি যেন কোনো যোগাযোগ মাধ্যম নয়, যেন একটি বিশালাকার বাঁধ।”

পরিবেশবিদদের মতে, স্বাভাবিক পানি প্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত কালভার্ট বা সেতু না রেখে উঁচু বাঁধের মতো করে রেললাইনটি নির্মাণ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, স্টেশন সংলগ্ন এলাকার প্রাকৃতিক জলাশয় ও খাল ভরাট করে অপরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি লোকালয়সহ রেলট্র্যাকে বন্দি হয়ে পড়ছে।

৮৮ লাখ টাকা ফেরতের আড়ালে বড় লুটপাটের নীলক নকশা?

টানা পাঁচ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় সরাসরি বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। শুধুমাত্র টিকিটের অর্থ বাবদ ফেরত দিতে হয়েছে ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং বাতিলের খাতায় গেছে ১১ হাজার ৩৩৭টি টিকিট।

ধস নেমেছে পরবর্তী দিনগুলোর অগ্রিম টিকিট বিক্রিতেও। কিন্তু অনুসন্ধানী নজর বলছে, এই লোকসানের চিত্রটি গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারের পেছনেও কাজ করছে সিন্ডিকেটের নতুন চাল।

অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের এই বিপর্যয়কে সুযোগ হিসেবে নিতে চায় চিহ্নিত ঠিকাদার ও অসাধু কর্মকর্তাদের চক্রটি।

সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয় ওই বিতর্কিত অংশকে আরও পাঁচ ফুট উঁচু করে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছে।

আর তাতেই চোখ চকচক করে উঠেছে সিন্ডিকেটের। সংস্কারের নামে ফের শত কোটি টাকার নতুন প্রকল্প সাজিয়ে ‘লুটপাটের মহোৎসব’ শুরুর সব প্রস্তুতিই নাকি চূড়ান্ত!

দুই স্টেশনের স্থায়ী ‘ওপেন সিক্রেট’ দুর্নীতি:

রেলওয়ে (পূর্ব)-এর সাবেক মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন অবশ্য এই মেগা নকশাগত ত্রুটিকে আড়াল করার সুরেই গণমাধ্যেমে কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, অতিবৃষ্টিতে শহর অংশের ৫০০ মিটার এলাকা পানিতে ডুবলেও অবকাঠামোগত কোনো বড় ক্ষতি হয়নি।

কিন্তু সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে খোদ রেলের নীচুতলার কর্মীদের প্রশ্ন-যদি অবকাঠামোগত ত্রুটিই না থাকে, তবে প্রতি বর্ষাতেই কেন জানআলী হাট ও ষোলশহর স্টেশন এলাকায় রেললাইন ডোবে?

বাস্তবতা হলো, জানআলী হাট ও ষোলশহর স্টেশনের অনিয়ম ও দুর্নীতি কোনো নতুন গল্প নয়। স্টেশন দুটিতে যাত্রী হয়রানি ও টিকিট কালোবাজারি যেন এক স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

টিকিট কালোবাজারির আখড়া: কাউন্টারে টিকিট ‘নেই’ বললেও স্টেশনের অসাধু বুকিং সহকারী ও নিরাপত্তা কর্মীদের হাত করলে কিংবা নির্ধারিত দালালের কাছে বাড়তি টাকা দিলেই মিলছে পছন্দসই আসন।

বিনা রশিদে অতিরিক্ত ভাড়া: টিকিট ছাড়া কোনো যাত্রী ট্রেনে উঠলে তাঁকে আইনি রসিদ না দিয়ে নগদ অর্থ পকেটে পোরার অভিযোগ অহরহ।

দুদকের হানা ও থমকে যাওয়া ফাইল: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে একাধিকবার আকস্মিক এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়ে কালোবাজারি চক্র ও রেল কর্মচারীদের হাতেনাতে ধরে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করেছিল।

তবে জিএম মো. সুবক্তগীনের দপ্তর থেকে তদারকি বৃদ্ধির মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সিন্ডিকেটের শক্ত শিকড় এতটুকু আলগা হয়নি।

জরুরি তদন্ত ও টেকসই সমাধানের দাবি

কক্সবাজার রুট বন্ধ থাকার কারণে কেবল টিকিট ফেরতের ৮৮ লাখ টাকাই রেলের ক্ষতি নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজারগামী হাজার হাজার পর্যটক ভ্রমণ বাতিল করায় পরোক্ষভাবে অন্যান্য দূরপাল্লার রুটেও ব্যাপক যাত্রী ও রাজস্ব হারিয়েছে সংস্থাটি।

প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করে, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা (ড্রেনেজ) না রেখে কার স্বার্থে এই ত্রুটিপূর্ণ নকশায় কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলো-এখন তার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল তদন্ত সময়ের দাবি।

সংস্কারের নামে নতুন করে যেন কোনো লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি না হয়, তার জন্য অবিলম্বে জানআলী হাট ও ষোলশহর স্টেশনের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে টেকসই ও বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রী ও নাগরিক সমাজ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি