ত্বক ফর্সা করার রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজের অজান্তেই শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন না তো? রূপচর্চার নামে বাজারে ছড়িয়ে থাকা কিছু প্রসাধনী এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য।
বাজারে প্রচলিত ৮টি ব্যান্ডের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমে মিলেছে অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রার ‘মার্কারি’ (পারদ), যা ত্বকের সুরক্ষাবলয় ধ্বংস করার পাশাপাশি কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসটিআই এই তথ্য নিশ্চিত করে অবিলম্বে ওই ৮ ব্র্যান্ডের ক্রিমের ক্রয়-বিক্রয়, বিতরণ ও মজুত থেকে সর্বসাধারণকে বিরত থাকার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে।
চোরাই পথে আসা বিষাক্ত প্রসাধনী
বিএসটিআই জানায়, দেশের প্রসাধনী বাজারে দিন দিন রং ফর্সাকারী ক্রিমের চাহিদা বাড়ায় একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বৈধ কাগজপত্রের তোয়াক্কা না করে লাগেজ কিংবা চোরাই পথে অনুমোদনহীন প্রসাধনী দেশে আনছে।
সীমান্ত ও চোরাপথ পেরিয়ে আসা এসব পণ্যের গুণগত মান পূর্বে যাচাইয়ের কোনো সুযোগ থাকে না।
সম্প্রতি সন্দেহজনক কিছু ক্রিম বাজার থেকে সংগ্রহ করে নিজস্ব ল্যাবে পরীক্ষা চালায় বিএসটিআই। ফলাফলে দেখা যায়, পণ্যগুলোতে মার্কারির উপস্থিতি নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে বহু গুণ বেশি।
বাংলাদেশ মান (বিডিএস ১৩৮২) অনুযায়ী, প্রসাধনীতে মার্কারির সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা হচ্ছে মাত্র ১.০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)। কিন্তু পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য আঁতকে ওঠার মতো!
বিএসটিআই ল্যাবে শনাক্ত হওয়া ৮ বিষাক্ত ক্রিম ও মার্কারির মাত্রা:
কোন ক্রিমে কত মার্কারি?
বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় পাকিস্তানের এস জে এন্টারপ্রাইজের চাঁদনি হোয়াটেনিং ক্রিমে মার্কারির উপস্থিতি পাওয়া গেছে ১২০ দশমিক ৩৯ পিপিএম। পাকিস্তানের কিউসিআই কোম্পানির নিউ ফেস বিউটি ক্রিমে শনাক্ত হয়েছে ৪৪ দশমিক ৭২ পিপিএম মার্কারি।
পাকিস্তানের লোয়া ইন্টারন্যাশনালের নাভিয়া বিউটি ক্রিমে পাওয়া গেছে ৫৯ দশমিক ৮২ পিপিএম, আর একই প্রতিষ্ঠানের নাভিয়া হোয়াটেনিং ক্রিমে পাওয়া গেছে ৭৯ দশমিক ৭০ পিপিএম মার্কারি।
পাকিস্তানের নুর এন্টারপ্রাইজের নুর হোয়াটেনিং ক্রিমে মার্কারি পাওয়া গেছে ৮২ দশমিক ৭৬ পিপিএম। এ ছাড়া পাকিস্তানের ক্রিয়েটিভ কসমেটিকসের ডিউ বিউটি ক্রিমে সর্বোচ্চ মাত্রার কাছাকাছি ১২৩ দশমিক ৩৭ পিপিএম মার্কারি শনাক্ত হয়েছে।
পাকিস্তানের গৌরি কসমেটিকস প্রাইভেট লিমিটেডের গৌরি বিউটি ক্রিমে পাওয়া গেছে ৫৬ দশমিক ৯৩ পিপিএম মার্কারি। অন্যদিকে, চীনের জিএলডিজেবি (হারবিন) কসমেটিকস কো. লি.-এর ন্যাচারাল পার্ল স্কিন ক্রিমে মার্কারির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে ৬৭ দশমিক ৪৯ পিপিএম।
অর্থাৎ, যেখানে বাংলাদেশ মান অনুযায়ী সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১.০০ পিপিএম, সেখানে পরীক্ষিত এসব ক্রিমে মার্কারির মাত্রা পাওয়া গেছে কয়েক দশক গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের হুশিয়ারি: ফর্সা হওয়ার স্বপ্নে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মার্কারিযুক্ত ক্রিম দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে সাময়িকভাবে ফর্সা ভাব এলেও পরবর্তীতে ত্বকের স্বাভাবিক মেলানিন ও সুরক্ষা স্তর একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়।
এতে ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া, খসখসে হওয়া, স্থায়ী লালচে বা কালো দাগ পড়া এবং মারাত্মক অ্যালার্জির সৃষ্টি হয়।
এখানেই শেষ নয়, ত্বক দিয়ে রক্তে প্রবেশ করা এসব মার্কারি ধীরে ধীরে কিডনি অকেজো করা, মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রে জটিলতা তৈরি এবং এমনকি গর্ভবতী নারীদের পেটে থাকা অনাগত শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চিরতরে ব্যাহত করতে পারে।
বিএসটিআইয়ের কঠোর অবস্থান ও পরামর্শ
জনস্বার্থ রক্ষায় কোনো রকম আপস করা হবে না জানিয়ে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাই বিএসটিআইয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যে কোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত প্রসাধনী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, নিরাপদ বাজার নিশ্চিত করতে বিএসটিআইয়ের নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, বাজার তদারকি, মোবাইল কোর্ট ও সার্ভিল্যান্স অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
একইসঙ্গে, সাধারণ ভোক্তাদের কোনো প্রকার অজ্ঞাত বা অনুমোদনবিহীন ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম কেনা ও ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যে কোনো প্রসাধনী কেনার আগে বিএসটিআইয়ের বৈধ অনুমোদন যাচাই করা এবং বাজারে ক্ষতিকর বা সন্দেহজনক পণ্য নজরে এলে দ্রুত বিএসটিআইকে জানানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

