ওয়াসার পাপের মাশুল চট্টগ্রামের ১ লাখ গ্রাহকের কাঁধে: প্রতি ফোঁটা পানিতে সুদের দায়!

নিজস্ব আয়ে দেউলিয়া,ওয়াসার নজর গ্রাহকের পকেটে

প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৬ ২০:৪৪

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সুপেয় পানি ও সুপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার স্বপ্ন এখন প্রায় এক লাখ পরিবারের জন্য এক নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্কের নাম।

পাইপলাইন খুললে নাগরিকদের ঘরে যে পানি পৌঁছাচ্ছে, তার প্রতি ফোঁটায় জমে আছে বিদেশি ঋণের চড়া সুদের চাপ আর ওয়াসার চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হলেও তার সুফল মেলেনি। উল্টো অপচয়, দুর্নীতি আর চরম অব্যবস্থাপনার দায় এসে চেপেছে সাধারণ নগরবাসীর ঘাড়ে।

চট্টগ্রাম ওয়াসের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সংস্থাটির ঘাড়ে এখন ঝুলছে ৬ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা। এর ওপর চলমান আরও তিনটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে গুনতে হবে ৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা এএফডি (১,৮৭২.১৩ কোটি টাকা), বিশ্বব্যাংক (৩,২৬৮.৭২ কোটি টাকা) ও জাপানের জাইকা (৪,১৪৪.২৮ কোটি টাকা)-সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসের মোট ঋণ ছুঁয়েছে প্রায় ১৫,৯৫৪ কোটি টাকা।

অথচ এই পর্বতসম ঋণ পরিশোধে ওয়াসের সক্ষমতার চিত্র হতাশাজনক। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে তারা পরিশোধ করতে পেরেছে মাত্র ৮৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে গড়ে মোটে ২২ কোটি টাকা!

অন্যদিকে, গত অর্থবছরে ওয়াসের আয় ছিল ৩৩৭ কোটি টাকা, আর পরিচালন ব্যয়ই গিলে খেয়েছে ৩০২ কোটি টাকা। এই সীমিত উদ্বৃত্ত দিয়ে প্রতিবছর বিদেশি ব্যাংকের কিস্তি ও সুদ মেটানো অসম্ভব জেনেও ওয়াসা নিজেদের অপচয় না কমিয়ে হাত বাড়াচ্ছে সাধারণ গ্রাহকের পকেটে।

সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে ‘সিস্টেম লস’ এর আড়ালে। ২০২৫-২৬ সালের সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, ওয়াসা ১ লাখ ৮১ হাজার ৮১০ মিলিয়ন লিটার পানি উৎপাদনে পরিচালন ব্যয়সহ মোট খরচ করে ৩০০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। প্রতি হাজার লিটারে ওয়াসের খরচ সাড় ১৬ টাকা।

কিন্তু তদারকির অভাব ও নজিরবিহীন গাফলতিতে উৎপাদিত পানির ১৯.৭৮ শতাংশ বা ৩ হাজার ৫৯৭ কোটি লিটার পানি পাইপলাইনেই গায়েব হয়ে যায়।

ফলে প্রকৃত উৎপাদন খরচ গিয়ে ঠেকে ২১ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি হাজার লিটার পানিতে আবাসিকে ৩ টাকা লোকসান গুণতে হলেও, এই অদৃশ্য ফুটো আর চুরির কারণে বছরে ওয়াসার পকেট থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে ৬৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা!

বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড (দৈনিক জনপ্রতি ১০০ লিটার পানি) হিসাব করলে, ওয়াসা প্রতিদিন গড়ে ৯ কোটি ৮৬ লাখ লিটার পানি স্রেফ মাটিতে ফেলে নষ্ট করছে। এই অপচয় করা পানি দিয়ে প্রতিদিন চট্টগ্রাম নগরের প্রায় ৯ লাখ ৮৬ হাজার নাগরিককে নিরবচ্ছিন্ন সুপেয় পানির আওতায় আনা সম্ভব হতো।

এমনকি ওয়াসা যদি তাদের সিস্টেম লস মাত্র ৪.৪৯ শতাংশ কমিয়ে আনতে পারত, তবে পানির দাম এক পয়সা না বাড়িয়েও বার্ষিক প্রায় ৩০৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় করা সম্ভব হতো।

কিন্তু সেই সংস্কারের পথে না হেঁটে এক দশকে চারবার পানির দাম বাড়ানো ওয়াসা আবারও নতুন করে ৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছে।

২০০৯ সালে যেখানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি হাজার লিটার পানিতে দিতে হতো ৫ টাকা ৪১ পয়সা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ টাকায়। বাণিজ্যিকে যা ১৫.৩২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৭ টাকা।

২০২২ সালে এক লাফে ৩৮ শতাংশ দাম বাড়ার পরও ওয়াসার পেট ভরেনি। অথচ সংস্থাটির ৯৩ শতাংশ গ্রাহকই সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত আবাসিক পরিবার, যাদের পিঠ আগেই দেওয়ালে ঠেকেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো ও ফুটো পাইপলাইনের কারণে শুধু পানির অপচয়ই হচ্ছে না, নর্দমার ড্রেনের নোংরা বর্জ্য ও ক্ষতিকর জীবাণু সুপেয় পানিতে মিশে তৈরি করছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। পানির নামে নগরবাসী কিনছে রোগব্যাধি।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইডের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. খায়রুল ইসলাম বলেন, সিস্টেম লস না কমিয়ে পানির দাম বাড়ানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

ওয়াসাকে আগে তাদের অপচয় এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে হবে। এরপর গণশুনানির মাধ্যমে ট্যারিফ কমিশন গঠন করে দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওয়াসার এই সুবিশাল ঋণের বোঝা সরকারের সরাসরি আর্থিক সহায়তা ছাড়া শোধ করা অসম্ভব। আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠির প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং সিস্টেম লস কমাতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে-প্রকল্পের অদূরদর্শী পরিকল্পনা, সীমাহীন অপচয় ও অদক্ষতার যে চক্র ওয়াসা তৈরি করেছে, তার চড়া মাশুল নগরবাসী আর কতদিন দেবে?

স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে মেগা প্রকল্পের ঋণ ও সিস্টেম লসের আড়ালের অনিয়ম উম্মোচন করা এখন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি