রাষ্ট্রের একটি অতি সংবেদনশীল জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ ‘ডিসি’ বা জেলা প্রশাসক পদটি বাগিয়ে নিতে সরাসরি টাকার বিনিময়ে লিখিত স্ট্যাম্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কন্ট্রোলার অব স্টোর্স মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ। (পরিচিতি নম্বর: ১৬৫২১)।
একটি ক্ষমতাধর তদবির সিন্ডিকেটের সঙ্গে তৈরি করা এই প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক দরদাম থেকে শুরু করে ঋণ চুক্তি, ব্যাংকের চেক হস্তান্তর ও স্বহস্তে লিখিত অঙ্গীকারনামার মতো নজিরবিহীন সব ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি চাকরির বিধিমালা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নূন্যতম নীতি-নৈতিকতার সব সীমা অতিক্রম করে ক্ষমতার শীর্ষ আসন কেনাবেচার এসব চাঞ্চল্যকর দলিল প্রকাশ পাওয়ায় গোটা প্রশাসন পাড়াজুড়ে তীব্র ধিক্কার ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বড় অঙ্কের টাকায় বন্দর ও ঘুষের কিস্তিতে ডিসির চেয়ার কেনাবেচার ভয়ংকর দলিল:
প্রাপ্ত নথি ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পদায়নের নামে সালাহউদ্দিন আহমেদের অবিশ্বাস্য ও বেপরোয়া আর্থিক লেনদেনের চিত্র। মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থাকা অবস্থাতেই সালাহউদ্দিন আহমেদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক পদে আসার ছক আঁকেন।
এ লক্ষ্যে ব্যবসায়ীর সঙ্গে নিজ হাতে সই করা সম্মতিপত্রে ৩০ কোটি টাকা নগদ গ্রহণের কথা উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিতে শর্ত দেওয়া হয়, মূল অর্থের দ্বিগুণ এবং অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জসহ মোট ৬৯ কোটি টাকা ১৮ মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে।
ওই অর্থের বড় একটি অংশ মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পদায়নের তদবিরে ব্যয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাতে আসা আরেকটি নথি বলছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে কর্মরত থাকাকালেই (১২ জুলাই ২০২৫ থেকে ২২ ডিসেম্বর ২০২৫) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক পদে আসার লক্ষ্যে তিনি এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ব্যবসায়ী আহমেদ শাকিল খানের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার শর্তে ৪ কোটি টাকা গ্রহণের তথ্য মেলে।
ওই অর্থের জামানত হিসেবে সালাহউদ্দিন নিজের সিটি ব্যাংকের দুটি চেকে ৪ কোটি টাকা হস্তান্তরের পাশাপাশি নিজের স্ত্রী লায়লা হাবিবা ও বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রও জিম্মাদার হিসেবে তুলে দেন।
উক্ত লেনদেনের ধারাবাহিকতায় ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাঁকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘পরিচালক’ পদে বদলি করা হয় এবং ২৩ ডিসেম্বর তিনি যোগদান করেন। পরবর্তীতে পদ খালি না থাকায় চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি তাঁকে ‘কন্ট্রোলার অব স্টোর্স’ পদে পদায়ন করা হয়। সূত্র-যুগান্তর
তবে কাঙ্ক্ষিত একক কর্তৃত্বপূর্ণ পদ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ সালাহউদ্দিন আহমেদ এক অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিংয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন,আমাকে দেওয়ার কথা ছিল এক পদ। ডিমোশন দিয়ে বসিয়েছে আরেক জায়গায়-আমি এখন নিঃস্ব।
বন্দর ভবনে দায়িত্ব পালনকালেই তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের পরবর্তী জেলা প্রশাসক (ডিসি) হওয়ার পদটি। ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে তিনি এক লিখিত সম্মতিপত্রে ডিসি পদে পদায়নে তাঁর কোনো আপত্তি নেই বলে আগাম ঘোষণা দেন।
এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে তিনি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার বগা বন্দর এলাকার বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান নামে এক সাধারণ ব্যবসায়ীকে নিজের ‘অনুমোদিত প্রতিনিধি’ হিসেবে নিয়োগ করেন, যাতে ওই ব্যক্তি লবিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের কাজ পরিচালনা করতে পারেন।
প্রশাসনের বুকে নজিরবিহীন ‘আর্থিক দেউলিয়াত্ব’
একজন প্রথম শ্রেণির ক্যাডার কর্মকর্তা কীভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ চেয়ারকে বাজারদরের মতো কেনাবেচার বস্তুতে পরিণত করলেন, তা নিয়ে স্তম্ভিত আইন ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি স্বাক্ষরিত সম্মতিপত্রে দেখা যায়, তিনি ৫০ কোটি টাকা ঋণ এবং ৪০ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ মোট ৭০ কোটি টাকা গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ১৮ মাসের মধ্যে তা দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধের অবিশ্বাস্য প্রতিশ্রুতি দেন।
এ বিশাল অঙ্কের জামানত হিসেবে তিনি সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের ব্যক্তিগত হিসাবের একাধিক চেকের পাশাপাশি ৮টি ব্ল্যাংক চেক এবং নিজের স্ত্রী লায়লা হাবিবা এবং আপন বোন জিনিয়াত খাতুনকে গ্যারান্টার রেখে ১৭ জুলাই লিখিত চুক্তি করেন।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিটি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে মোট ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার চেক, একাধিক ব্ল্যাংক চেক এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ক্ষমতার দেনাপাওনার হিসাব নথিবদ্ধ করার তথ্য পাওয়া গেছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, সরকারি পদে থেকে কোনো কর্মকর্তা যদি এভাবে পদায়নের উদ্দেশ্যে কোটি কোটি টাকার চেক হস্তান্তর ও চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন, তবে তা ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’, ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর চরম লঙ্ঘন।
একইসঙ্গে এটি ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭’, ‘দণ্ডবিধি, ১৮৬০’ এবং ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন’-এর আওতায় চূড়ান্ত অসদাচরণ ও কঠোর শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
চবক উপসচিব সালাহউদ্দিনের ভয়ংকর রাজত্ব
চাঞ্চল্যকর এই আর্থিক লেনদেন ও নথিপত্র ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে তুমুল তোলপাড় শুরু হয়।
তবে অনুসন্ধানী গণমাধ্যম টিমের মুখোমুখি হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহমেদ। সুত্র-এসএমবি
তিনি বলেন, আমি এই চেকগুলো লবিং এবং তদবিরের জন্য দিয়েছি। আসলে এসব দেওয়াটা আমার অন্যায় হয়েছে। আপনারা এসব প্রচার করবেন না। প্রচার করলে এতে আমার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে।
সম্প্রতি জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার চট্টগ্রাম কার্যালয়ে বসে সব সাংবাদিকদের বড় অঙ্কের টাকায় প্রভাবিত বা ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টার বিষয় প্রকাশ পেলে আলোচনা আরও বৃদ্ধি পাই।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম গণমাধ্যমকে জানান, বিষয়টি নজরে আসার পর গতকাল শনিবার এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে আইন ও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে প্রশাসনিক সচেতন মহল মনে করছে, রাষ্ট্রের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে আসীন হওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার এই ভয়ংকর বাজি অনিয়ম ছাড়াও এটি গোটা প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক আর্থিক ও নৈতিক ঝুঁকি।
নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে এই চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

