শিপইয়ার্ডে নিরাপত্তার নামে অবহেলার পুনরাবৃত্তি: বিষাক্ত বাতাসে নিভে গেল ৯ প্রাণ!

তদন্তে অবহেলার দাগ, মৃত্যুর মিছিলে নিভে গেল একাধিক পরিবারের স্বপ্ন

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৩৯

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলে স্ক্র্যাপ জাহাজের বিশালাকার লোহার কাঠামোর ভেতর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করাই যেন ওদের নিয়তি।

কিন্তু সেই নিয়তিই যে শুক্রবারের ভোরে বিষাক্ত ফাঁদ হয়ে দাঁড়াবে, তা কে জানত?

উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকার ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে’ একটি তেলের ট্যাংক থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন শ্রমিক।

দুর্ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শুক্রবার ভোরে ইয়ার্ডে নোঙর করা একটি পুরাতন জাহাজে হাউসকিপিং ও স্ক্র্যাপ কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা।

কাজ চলার একপর্যায়ে হঠাৎ জাহাজের অভ্যন্তরীণ একটি ট্যাংক থেকে মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস বের হতে শুরু করে।

মুহূর্তের মধ্যেই সেটির প্রভাবে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একের পর এক ঢলে পড়েন শ্রমিকরা।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখান থেকে দুই শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

বাকিদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে আরও ছয়জন মারা যান।

এছাড়া নগরীর একটি বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোহাম্মদ শরীফ নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের আকবর আলীর হাটের দুই ভাই-মোহাম্মদ মনসুর ও মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন। প্রিয়জন হারানোর শোক সামলাতে পারছে না তাদের পরিবার।

এ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন খাদেম পাড়ার হাবিবুর রহমান, ভাটিয়ারির পলাশ দাস ও সানি দাস।

নিহত অন্য শ্রমিকরা হলেন পাবনার সুজানগরের মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন, গাইবান্ধা সদরের মোহাম্মদ রানা মিয়া এবং সুন্দরগঞ্জের মোহাম্মদ খোকন মিয়া।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম নিহতের ঘটনা নিশ্চিত করেছেন।

ফায়ার সার্ভিসের সীতাকুণ্ড স্টেশনের অফিসার আল মামুন জানান, দুর্ঘটনার পরপরই আমরা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করি, জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এখনও কাজ চলছে।

ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, ইয়ার্ডে কাজ করার সময় দুর্ঘটনা ঘটে এবং আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক বেশ কয়েকজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের (ডিআইজি) উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান জানান, ইয়ার্ডের শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না এবং এটি স্রেফ গ্যাস নির্গমন নাকি কোনো অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের ঘটনা, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে এই রক্তক্ষরণ নতুন কিছু নয়। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর জিয়া সুবেদার গ্রুপের মালিকানাধীন এই শিপইয়ার্ডেই তেলের ট্যাঙ্কার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়েছিলেন ৮ জন শ্রমিক।

এছাড়া ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের এসএন করপোরেশন কারখানায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১২ জন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে ৬ জন পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান।

বারবার তদন্ত কমিটি গঠন হলেও শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তায় কার্যকর কোণো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয় না-এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের।

একটার পর একটা প্রাণ ঝরে গেলেও সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে অরক্ষিত নিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্র রয়ে গেছে আগের মতোই।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি