চট্টগ্রাম নগরীর অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদিঘী পূর্ব কর্পোরেট শাখার ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা উধাও হওয়ার ঘটনায় তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
পুলিশের দাবি, কোনো বাইরের চক্র নয়, ব্যাংকেরই সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন (৪১) দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে ধাপে ধাপে ওই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন ব্যবসায়ী মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫)। আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ দিয়ে হাটহাজারীতে ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ নামে গরুর খামার গড়ে তোলার তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।
প্রতিদিনের মতো ব্যাংকের ভল্ট এ নগদ টাকা জমা হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে টাকার বান্ডিল। বাইরে থেকে দেখলে সবই স্বাভাবিক। হাজার টাকার নোটের বান্ডিল-গোছানো, বাঁধা, হিসাবের খাতায়ও সব ঠিকঠাক। কিন্তু সেই ‘ঠিকঠাক’ বান্ডিলের ভেতরেই ছিল কারসাজি।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ১ হাজার টাকার নোটের বান্ডিলের ভেতরে কৌশলে ১০০ টাকা কিংবা তার চেয়ে কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে রাখা হতো। ফলে বাইরে থেকে বান্ডিল দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, সেখানে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা নেই।
আর ভল্টের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি নিজেই যখন হিসাব মিলিয়ে রাখেন, তখন ঘাটতিটিও দীর্ঘ সময় থেকে যায় আড়ালে।
এই কৌশলেই ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৪ মাসে ধাপে ধাপে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেনের বিরুদ্ধে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নগদ অর্থ জমা রাখার সময়ই বান্ডিলে কারসাজি করা হতো। ১ হাজার টাকার নোট থাকার কথা থাকলেও বান্ডিলের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো ১০০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের নোট। ফলে বান্ডিলের বাইরের কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকত। কিন্তু প্রকৃত টাকার পরিমাণ কমে যেত।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভল্টের দায়িত্বে থাকায় কামরুল হোসেন নিজেই হিসাব মিলিয়ে রাখতেন। এ কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের এই ঘাটতি অন্যদের নজরে আসেনি বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে।
এক-দুই দিনের ঘটনা নয়-এই প্রক্রিয়া চলেছে দীর্ঘ ১৪ মাস। আর সময় যত গড়িয়েছে, জমেছে ঘাটতির অঙ্কও। শেষ পর্যন্ত সেই অঙ্ক গিয়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকায়।
তদন্তের দ্বিতীয় স্তরে এসে সামনে আসে ব্যবসায়ী মো. জাফরুল্লাহ তানভীরের নাম। পুলিশের দাবি, আত্মসাৎ করা অর্থ তানভীরের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হতো। অর্থাৎ ব্যাংকের ভল্ট থেকে সরানো অর্থের ব্যবস্থাপনা ও স্থানান্তরের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ দিয়ে হাটহাজারী উপজেলার উত্তর বুড়িশ্চর এলাকার ফজদের আলী ফকির বাড়িতে গড়ে তোলা হয় ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ নামে একটি গরুর খামার। খামারটির দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন সহযোগী তানভীর।
একদিকে ব্যাংকের ভল্ট থেকে ধাপে ধাপে অর্থ সরানোর অভিযোগ, অন্যদিকে সেই অর্থের একটি অংশ দিয়ে গড়ে ওঠা খামার-তদন্তে এখন এই দুই প্রান্তের যোগসূত্রই খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো-৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার মতো বিপুল ঘাটতি কীভাবে প্রায় ১৪ মাস ধরে নজরের বাইরে থাকল?
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যে কৌশলের কথা উঠে এসেছে, সেটিই এই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বান্ডিলের বাইরে বড় কোনো পরিবর্তন না এনে ভেতরে কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে দিলে বাইরে থেকে সেটি স্বাভাবিক বান্ডিল বলেই মনে হতে পারে। তার সঙ্গে যদি ভল্টের হিসাবও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে ঘাটতি শনাক্ত হতে সময় লাগার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কোন কোন স্তরে এই ঘটনা নজর এড়িয়ে গেল, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তদন্ত এখন শুধু ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার হিসাবেই আটকে নেই। কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ১৪ মাস ধরে ধাপে ধাপে টাকা সরানোর প্রমাণ মিলেছে।
তবে আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে তারা আর কোথাও সম্পত্তি বানিয়েছেন কিনা, কিংবা এই বিশাল অঙ্কের অর্থ লোপাটের নেপথ্যে অন্য কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছেন কিনা-সেসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
অর্থাৎ ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ই শেষ গন্তব্য, নাকি আত্মসাৎ করা অর্থের আরও কোনো ব্যবহার বা সম্পদের সন্ধান মিলবে-সেটিও এখন তদন্তের প্রশ্ন।
ঘটনার পর অগ্রণী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে নগরের কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ ব্যাংক কর্মকর্তা মো. কামরুল হোসেন (৪১) এবং তার সহযোগী ব্যবসায়ী মো. জাফরুল্লাহ তানভীরকে (২৫) গ্রেফতার করে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আদালতে তারা দুজনই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে আত্মসাতের পুরো প্রক্রিয়া, অর্থের গতিপথ এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কিনা-এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
ঘটনাটি শুধু ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ভল্ট ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচিত ভল্টেই যদি দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে ধাপে ধাপে বিপুল অর্থের ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে সেখানে হিসাব যাচাই, দায়িত্ব বণ্টন, অভ্যন্তরীণ অডিট এবং নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এই ঘটনায় তদন্ত যদি শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো কর্মকর্তা বা সহযোগীর সম্পৃক্ততা শনাক্ত করতে পারে, তাহলে পুরো ঘটনার চিত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

