চট্টগ্রাম রেঞ্জের হাটহাজারী সদর বিটে সামাজিক বনায়নের কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ, গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব এবং এক বিট কর্মকর্তার মৃত্যুকে ঘিরে নানা অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন একই সার্কেলে দায়িত্ব পালন করা তৎকালীন হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সদর (শহর) রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ ১৪ বছর একই সার্কেলে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিয়ে মো. সাইফুল ইসলাম সেখানে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখলবাজি এবং ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করে নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন
সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী একই সার্কেলে পাঁচ বছরের বেশি পদায়নের সুযোগ না থাকার কথা উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা বলছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় একই এলাকায় প্রভাব বজায় রেখেছেন।
বাগানের গাছ উধাও, রাজস্বের হিসাব কোথায়
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১-১২ সালে হাটহাজারী সদর বিটে ২০ হেক্টর ও ৩৩ হেক্টর আয়তনের দুটি সামাজিক বনাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিলামের মাধ্যমে বাগান দুটির গাছ বিক্রি করা হয়।
এর মধ্যে ২০ হেক্টরের বাগানের ১২টি লটের বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। আর ৩৩ হেক্টরের বাগানের লটগুলোর বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুটি বাগানের নিলাম থেকে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, বন বিধিমালা অনুযায়ী ব্যাংক চালান ছাড়া কাঠ কাটার সুযোগ না থাকলেও তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম তাঁর পছন্দের ঠিকাদারদের ট্রেজারি চালান ছাড়াই হাজার হাজার ঘনফুট কাঠ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেন।
পরবর্তীতে নতুন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী দায়িত্ব নেওয়ার পর সরেজমিনে গিয়ে বাগান দুটি ফাঁকা দেখতে পান। কিন্তু দপ্তরের নথিতে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকার রাজস্ব জমার ব্যাংক চালান পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এদিকে বন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে গাছ চুরির সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও উঠেছে।
১৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকার ভাউচার, প্রশ্ন কোটি টাকার হিসাব নিয়ে
ঘটনাটি লিখিতভাবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে জানানোর পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চলতি বছরের ১৩ আগস্ট তড়িঘড়ি করে মো. সাইফুল ইসলামের বর্তমান পদের সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫০ টাকার একটি ভাউচার তৈরি করে কোষাগারে জমা দেখানো হয়।
একই সময়ে কোটি কোটি টাকার এই হিসাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মূল দরপত্র ও কার্যাদেশের নথি দপ্তরের ফাইল থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগও রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, দুটি সামাজিক বনাঞ্চলের নিলাম থেকে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা রাজস্ব নির্ধারিত থাকলে তার বিপরীতে মাত্র ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫০ টাকার ভাউচার কীভাবে তৈরি হলো এবং বাকি অর্থের হিসাব কোথায়?
অডিট নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অডিট ব্যবস্থা। সূত্রের দাবি, টানা তিন বছর ধরে প্রায় আড়াই কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া হলেও বিষয়টি অডিট দলের নজরে আসেনি।
একাধিক সূত্রের অভিযোগ, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ দিয়ে অডিট টিম ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে রাখা হয়েছিল।
তবে এত বড় অঙ্কের সরকারি অর্থের হিসাব নিয়ে দীর্ঘ সময় প্রশ্ন না ওঠার বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ভেতরে লুকানো তথ্য, নেপথ্যে কারা-তাদের মুখোশও উন্মোচন করতে আমাদের বিশেষ অনুসন্ধানী টিম মাঠে কাজ করছে। শীঘ্রই সকল তথ্যসহ সিরিজের পরবর্তী পর্বে তা প্রকাশ করা হবে।
মানসিক চাপের অভিযোগ, বিট কর্মকর্তার মৃত্যু
ঘটনার তদন্তে গত ৩১ আগস্ট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডক্টর আবু নাসের মহসিন হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি দল হাটহাজারী সদর বিট পরিদর্শনে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনিয়মের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে তৎকালীন বিট কর্মকর্তা লুৎফর রহমানের ওপর মো. সাইফুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা চরম মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন।
তীব্র অসুস্থতা ও আকুতির পরও লুৎফর রহমানকে প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে উঠতে বাধ্য করা হয়। পাহাড়ে ওঠার সময় শারীরিক ও মানসিক চাপে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
লুৎফর রহমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারও কোনো দায় বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।
তদন্তের পর গোলাগুলি, আতঙ্কের অভিযোগ
বিট কর্মকর্তার মৃত্যুর পর তদন্ত দল ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা এবং ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে মো. সাইফুল ইসলাম তাঁর নিজস্ব সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করেছেন-এমন অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের পরপরই পাহাড়ে দফায় দফায় ভারী অস্ত্রের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
এসব গোলাগুলির ঘটনা প্রকৃতপক্ষে কী কারণে ঘটেছিল, কারা এতে জড়িত ছিল এবং তদন্তের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না-তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়।
বঞ্চিত উপকারভোগীরা
দীর্ঘ ১৪ বছরের দায়িত্বকালকে ঘিরে মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে জিআরএসে ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা রাজস্ব আত্মসাৎ এবং ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় লভ্যাংশের ৪০ শতাংশ অর্থ না পেয়ে স্থানীয় শত শত দরিদ্র উপকারভোগী বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সামাজিক বনায়নের মতো কর্মসূচির মূল লক্ষ্য যেখানে দরিদ্র ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত করা, সেখানে বছরের পর বছর ধরে এসব অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন কেন উঠবে?
স্থানীয় জনতা ও সচেতন সমাজের পক্ষ থেকে গায়েব হওয়া নথি উদ্ধার, সামাজিক বনায়নের অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ এবং বিট কর্মকর্তা লুৎফর রহমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, রাজস্ব আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অন্যান্য অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁকে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. সাইফুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্যের জন্য নানাভাবে কয়েকদিন ধরে চেষ্টা করা হলেও তিনি এড়িয়ে গেছেন। পরবর্তীতে তার বক্তব্য গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য : অভিযোগকারীরা তাঁর কর্মকাণ্ডে মদদদাতা হিসেবে যাঁদের নাম বা ভূমিকার কথা বলছেন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ফরেনসিক যাচাই, ব্যাংক ও কোষাগারের হিসাব পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যসহ চোখ কপালে উঠার মত প্রতিবেদন থাকছে সিরিজের তৃতীয় পর্বে, চোখ রাখুন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


