চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের ওয়াপদা এইচ ব্লকের হালিমা মঞ্জিল নামক আবাসিক ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে কাজ শুরু হরেছে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি।
ফায়ার সার্ভিসের এই কমিটি বিস্ফোরণের সম্ভাব্য সব কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবনের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে তদন্তকাজে ভবন মালিক অসহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ করেছে ফায়ার সার্ভিস। এ বিস্ফোরণে দগ্ধ ৯ জনের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইতিমধ্যে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার (২ মার্চ) বিকেলে বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান।
পরিদর্শনকালে সাঈদ আল নোমান বলেন, এই দুর্ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। বর্তমান শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে জনবহুল এলাকা, আবাসিক ভবন, শিল্পাঞ্চল, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।” তিনি অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা জোরদার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, দাহ্য পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা এবং প্রতিটি ভবনে মানসম্মত ফায়ার সেফটি সরঞ্জাম—যেমন ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার ব্ল্যাঙ্কেট, স্মোক ডিটেক্টর—পর্যাপ্ত পরিমাণে স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের জন্য হটলাইন নম্বরগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করার আহ্বান জানান।
এর আগে গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোরে হালিশহরের হালিমা মঞ্জিলের তৃতীয় তলায় শাখাওয়াত হোসেনের বাসায় হঠাৎ এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বুধবার (৪ মার্চ) সকালে ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি পুরো ভবনটি ঘুরে দেখে।
অনুসন্ধানকালে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা রান্নাঘরের চুলা, গ্যাসের লাইন, বিদ্যুতের তারসহ অন্যান্য কক্ষ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সেই সঙ্গে ভবনের লিফটে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা হয়।
এদিকে, এ ঘটনায় এখনো আতঙ্কিত ভবনের বাসিন্দারা। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাটের এক বাসিন্দা বলেন, ‘এ ঘটনায় আজকে আমিও মারা যেতে পারতাম। বিকট শব্দ হয়েছে। আমার ফ্ল্যাটের পাঁচটি দরজা-জানালা সব ভেঙে গেছে। আমি দৌড়ে সামনে আসলাম। তখন দেখলাম আগুন।
আসলে কী কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, তা আমরা জানতে চাই। সম্পূর্ণ ঘটনা চার থেকে পাঁচ মিনিটে ঘটে গেছে। কাউকে বাঁচানোর পর্যন্ত সময় পাইনি আমরা। আমরা অনেক আতঙ্কিত।’
ভবনের কেয়ারটেকার সম্রাট বলেন, ‘যে দরজাগুলো ভেঙেছে, সেগুলো ঠিক করে আমরা লাগিয়েছি। কারণ, যে কেউ এসে ঢুকে পড়ে। ভেতরে অনেক জরুরি জিনিস আছে। সেফটির জন্যই ভাড়াটিয়ার দরজাগুলো লাগিয়ে দিয়েছি।’
মালিকের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস চিঠি দিয়েছিল মালিকপক্ষকে থাকার জন্য। এখন মালিককে কল দিচ্ছি, তিনি রিসিভ করছেন না। কোথায় আছেন, সেটিও জানতে পারছি না।’
তদন্তে সহায়তার জন্য আগে থেকে চিঠি দেয়া হলেও ভবন মালিক অসহযোগিতা করছেন বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত টিমের প্রধান মো. জসীম উদ্দীন।
তিনি বলেন, ‘ঘরের ভেতর গ্যাস জমে বিস্ফোরণ নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, তা তদন্তে উঠে আসবে।
আমরা প্রত্যেকটা রুমে তল্লাশি করেছি। রেসকিউ টিম, স্পেশাল টিমসহ সবাই এখানে এসেছি। বিস্ফোরণের প্রধান কারণটা আমরা উদ্ঘাটন করতে চাই।’
নানা সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন রকম মন্তব্য পেয়েছি। কেউ বলেছে লিফটের কারণে ঘটনাটি ঘটেছে, কেউ বলেছে এসি বা আইপিএস থেকে হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছে, বাইরে থেকে জানালা দিয়ে বিস্ফোরক জাতীয় দ্রব্য বা কেমিক্যাল ছুড়ে মেরে ইচ্ছাকৃতভাবে নাশকতামূলক ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
আমরা রান্নাঘর দেখেছি, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাইনের গ্যাস চেক করেছি। বদ্ধ পরিবেশে মিথেন গ্যাসের ঘনত্ব ৫ থেকে ১৫ শতাংশ হলে এবং সেখানে কোনো স্পার্ক হলে এ ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
তদন্ত করে কারণ উদ্ঘাটন করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মতামত নেয়া হবে।’
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ‘আমরা চিঠি দিয়ে আসছি, কিন্তু মালিকপক্ষের কোনো প্রতিনিধি আসেননি।
তিনি তার কেয়ারটেকারকে রেখেছেন, যিনি সব কিছুর সদুত্তর দিতে পারছেন না। সেই সঙ্গে ভবনে সেফটির বিষয়ে কোনো কিছু দেখা যায়নি।’
ফায়ার সার্ভিসকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে ভবনের অনুমোদন সঠিক ছিল কি না বা কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা-ও জানাতে মালিকপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



