একই দিন। দুটি আলাদা স্থান। কিন্তু মৃত্যুর কারণ এক। সেপটিক ট্যাংক ও ওয়াটার রিজার্ভ ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস।
শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুড়িং থানাধীন ধনিয়ালাপাড়া এবং জেলার রাউজান উপজেলার দুটি পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চার নির্মাণশ্রমিক।
চারটি মৃত্যু আবারও প্রশ্ন তুলেছে—নির্মাণ খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা কি এখনও কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ?
নগরীর ডবলমুড়িং থানাধীন ধনিয়ালাপাড়া এলাকার জাকির ম্যানশনের পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ওয়াটার রিজার্ভ ট্যাংকের সেন্টারিং খুলতে নেমেছিলেন দুই শ্রমিক। কিন্তু তারা আর ওপরে ফিরতে পারেননি।
নিহতরা হলেন নোয়াখালীর সদর উপজেলার উত্তর শূন্যকিয়া এলাকার সাকিব এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী এলাকার হৃদয় মিয়া (২৫)।
বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে অচেতন অবস্থায় তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্যাংকে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়েই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ঝিকুটি পাড়ায় ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা।
রতন ডাক্তারের নির্মাণাধীন বাড়ির দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংকে প্রথমে নামেন প্রদীপ দাশ। বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বাঁচাতে নিচে নামেন সমীরণ দাশ।
কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়েও তিনিও একই গ্যাসে আক্রান্ত হন। পরে ফায়ার সার্ভিস তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত প্রদীপ দাশ ছিলেন রতন ডাক্তারের জামাতা। সমীরণ দাশের বাড়ি বোয়ালখালীর কদুরখিল এলাকায়।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংকে প্রথমে প্রদীপ নামলে বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে উদ্ধার করতে নেমে সমীরণও গ্যাসে আক্রান্ত হন।
পরে ফায়ার সার্ভিস তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই দুটি ঘটনায় চারটি মৃত্যুর পরিসংখ্যান, চারটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন, অসহায় হয়ে পড়া সন্তান-স্বজন, আর জীবিকার জন্য প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা হাজারো নির্মাণশ্রমিকের অনিশ্চিত বাস্তবতা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সেপটিক ট্যাংক কিংবা ওয়াটার রিজার্ভ ট্যাংকে নামার আগে বিষাক্ত গ্যাস পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, অক্সিজেন সরবরাহ, সেফটি হারনেস, গ্যাস ডিটেক্টর বা উদ্ধার-প্রশিক্ষণ—এসব মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা হয় না। ফলে অদৃশ্য এই বিষাক্ত গ্যাস মুহূর্তেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
রাউজানের ঘটনায় আরও একটি পরিচিত কিন্তু ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে এসেছে—একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজনের মৃত্যু।
মানবিক তাগিদে সহকর্মী বা স্বজন নিচে নেমে পড়েন, কিন্তু প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না থাকায় তারাও একই পরিণতির শিকার হন। ফলে একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই রূপ নেয় বহু প্রাণহানির ঘটনায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ সেপটিক ট্যাংক ও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রিজার্ভ ট্যাংকে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেনসহ প্রাণঘাতী গ্যাস জমে থাকতে পারে। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল।
প্রশ্ন একটাই—আর কত মৃত্যু হলে নির্মাণ খাতে নিরাপত্তা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে? প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কারণ জীবিকার জন্য কাজে নেমে কোনো শ্রমিকের মৃত্যু কখনোই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না।
চট্টগ্রামের শুক্রবারের এই দুই ট্র্যাজেডি আবারও মনে করিয়ে দিল—অদৃশ্য বিষাক্ত গ্যাসের চেয়ে ভয়ংকর হলো নিরাপত্তার প্রতি অবহেলা।
আর সেই অবহেলার মূল্য দিচ্ছেন শ্রমিকরা, রেখে যাচ্ছেন চারটি শোকাহত পরিবার, অগণিত অশ্রু এবং সমাজের বিবেকের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

