সিএমপি সদরঘাট থানায় যোগদানের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৭ দিন। কিন্তু এর মধ্যেই বিতর্কের ঝুলি এতটাই ভারী হয়ে উঠেছিল যে, শেষ রক্ষা হলো না ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শরীফের।
মামলার আলামত গায়েব, বিচারের নামে প্রহসন, এমনকি শিশুর লাশের ময়নাতদন্তের নামে অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর ও অমানবিক অভিযোগ মাথায় নিয়ে অবশেষে আকস্মিকভাবে বদলি হতে হলো তাকে।
তবে বদলিজনিত সরকারি চিঠিতে প্রথাগতভাবে ‘জনস্বার্থে’ শব্দটির আড়ালে আসল কারণটি ঢাকা রাখা হয়েছে।
রবিবার (৫ জুলাই) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ওসি মোহাম্মদ শরীফকে সদরঘাট থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত ১৮ জুন সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ (সিটি এসবি) থেকে সদরঘাট থানার ওসি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মোহাম্মদ শরীফ।
এর আগে তিনি কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডের ছায়া সদরঘাট থানাতেও তাঁর পিছু ছাড়েনি।
বিয়েবাড়ি বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংযোগ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কর্ণফুলী থানায় থাকাকালীন স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন মোহাম্মদ শরীফ।
একটি নিরপেক্ষ বাহিনীর দায়িত্বশীল পদে থেকে রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগে তৎকালীন সময়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। ওই ঘটনার পরই তাকে কর্ণফুলী থানা থেকে সরিয়ে সিটি এসবিতে বদলি করা হয়েছিল।
আদালতের কাঠগড়ায় ওসির ‘কারসাজি’
মোহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে বিচার বিভাগ থেকে। একটি মামলার অত্যন্ত সংবেদনশীল আলামত গায়েবের ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক সিরাজাম মুনীরা ওসি শরীফসহ ছয় পুলিশ কর্মকর্তাকে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে আদালত দেখতে পান, পূর্ববর্তী তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জব্দ করা আলামত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ম অনুযায়ী বুঝে না নিয়েই তাড়াহুড়ো করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন তিনি।
একটি ফৌজদারি মামলায় ওসির এমন অপেশাদার ও সন্দেহজনক আচরণে ক্ষুব্ধ হন আদালত।
১০ বছরের শিশুর লাশ নিয়েও বাণিজ্য!
ওসি শরীফের বিরুদ্ধে সবচেয়ে অমানবিক অভিযোগটি ওঠে গত বছরের জুলাই মাসে। কর্ণফুলী থানা এলাকায় জিহাদ নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর লাশের ময়নাতদন্তের নামে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
এখানেই শেষ নয়, পরবর্তীতে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে শিশুটির অসহায় মা ছেনোয়ারা বেগমকে মুখ বন্ধ রাখার জন্য উল্টো ঘুষ সাধেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপটের কাছে হেরে না গিয়ে ওই সময় ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করেন এবং এই ওসির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সদরঘাট থানায় যোগদানের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় এই বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তার ‘ক্লোজড’ হওয়ার ঘটনাটি পুলিশের অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-আইনের রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ মানুষ কার কাছে যাবে?
অপরাধের এই দীর্ঘ খতিয়ান মাথায় নিয়ে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

