বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ: ৬ বছর পর পতেঙ্গার সেই রাজীবের যাবজ্জীবন

প্রকাশিত: ০৬ জুলাই, ২০২৬ ১৮:৫০

ভালোবাসার গভীরতা মেপেছিলেন বিয়ের আশ্বাসে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের আড়ালে যে এক ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা ও প্রতারণা ওত পেতে ছিল, তা হয়তো ভাবতেও পারেননি চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাটঘর হিন্দুপাড়া এলাকার এক তরুণী।

অবশেষে দীর্ঘ ছয় বছরের আইনি লড়াই, সামাজিক গ্লানি আর অপেক্ষার অবসান ঘটল।

বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ঘরে ঢুকে জোরপূর্বক ধর্ষণের দায়ে মো. রাজীব (২৮) নামের এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

আজ সোমবার (৬ জুলাই) চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক এস এম জিয়াউর রহমান জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।

কারাদণ্ডের পাশাপাশি আদালত আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী কফিল উদ্দীন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলায় মোট পাঁচজন সাক্ষীর জবানবন্দি ও উপস্থাপিত অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই দৃষ্টান্তমূলক রায় দেন।

রায় ঘোষণার সময় আসামি রাজীব আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কড়া নিরাপত্তায় সাজা পরোয়ানামূলে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার নথি ও ভুক্তভোগী পরিবারের বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। পতেঙ্গা থানার কাটঘর হিন্দুপাড়া এলাকায় এক চিলতে ভাড়া বাসায় মায়ের সঙ্গে থাকতেন ওই তরুণী।

মা জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের মতো সেদিন দুপুরেও ছিলেন কর্মস্থলে। ঘরে একা ছিলেন তরুণী। এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রেমিক রাজীব।

বিয়ে করবেন। এমন অলীক স্বপ্ন ও আশ্বাসের জাল বুনে তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন রাজীব।

সেদিন দুপুরে মায়ের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে হুট করেই বাসায় ঢোকেন তিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর তরুণীর মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক তার ওপর চালান পাশবিক নির্যাতন।

নির্যাতনের পর রাজীব যখন নিজেকে আড়াল করতে ওয়াশরুমে যান, তখনই ঘুরে দাঁড়ায় অবদমিত সেই তরুণী। চরম ট্রমার মধ্যেও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি বাইরে থেকে ওয়াশরুমের দরজা আটকে দেন।

এরপর চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডেকে জড়ো করেন। বাড়ির মালিক ও স্থানীয় লোকজন এসে ওয়াশরুম থেকে রাজীবকে হাতেনাতে আটক করে।

পরে ওই তরুণীকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়।

এই ঘটনার পর ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ভুক্তভোগী তরুণীর মা বাদী হয়ে পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ ঘটনার তদন্ত শেষে ওই বছরেরই ১৩ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।

আজ দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বয়ে বেড়ানো এক মায়ের কান্না আর তরুণীর অপমানের বিচার নিশ্চিত হলো রায়ের মাধ্যমে।

আদালত চত্বরে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীরা বলছেন, এই রায় সমাজের সেসব অপরাধীর জন্য এক কঠোর বার্তা, যারা প্রেমের নামে নারীর সরলতাকে পুঁজি করে লালসা মেটায়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি