পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যানটি ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা হয়েছিল চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য ছিল কর্ণফুলীর ইছানগর এলাকার মাসুদ পোর্ট কোম্পানিতে কাঁচামাল পৌঁছে দেওয়া।
কিন্তু কর্ণফুলী টানেলের টোলপ্লাজার সামনে আসতেই হঠাৎ যেন ‘হাওয়া’ হয়ে গেল ১২ হাজার ২৩৯ কেজি সাইজিং লাইনার পেপারসহ আস্ত একটি কাভার্ডভ্যান!
চালকসহ সংশ্লিষ্টদের মুঠোফোনও হয়ে গেল বন্ধ। তবে অপরাধীদের সেই ‘নিখুঁত’ পরিকল্পনা টেকেনি ৪৮ ঘণ্টাও।
কর্ণফুলী থানা পুলিশের মাত্র ৩৬ ঘণ্টার এক রুদ্ধশ্বাস ও বিশেষ অভিযানে উদ্ধার হয়েছে আত্মসাৎ হওয়া বিপুল পরিমাণ কাগজ ও কাভার্ডভ্যানটি।
এ ঘটনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে চক্রের ৬ সদস্যকে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৬ জুলাই রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের ‘মহিউদ্দিন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ’ থেকে ২১ রোল (১২ হাজার ২৩৯ কেজি) সাইজিং লাইনার পেপার নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় রাজাপুরি ট্রান্সপোর্টের একটি কাভার্ডভ্যান (ঢাকা মেট্রো-ট-১১-৫৩৬৩)।
গত ৯ জুলাই দুপুরে গাড়িটি কর্ণফুলী টানেলের টোলপ্লাজার সামনে পৌঁছায়।
কিন্তু গন্তব্যে না গিয়ে চালক ও তাঁর সহযোগীরা মিলে মালামাল আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে নিজেদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে গা-ঢাকা দেন।
নির্ধারিত সময়ে পণ্য না পৌঁছানো এবং চালকের সন্ধান না পাওয়ায় গত ১২ জুলাই কর্ণফুলী থানায় দণ্ডবিধির ৪০৭/৪২০/৩৪ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইখতিয়ারউদ্দিন।
মামলা দায়েরের পরপরই তদন্তে নামে কর্ণফুলী থানার একটি চৌকস দল। এসআই মো. শফি উল্লাহ, এসআই মো. আশিক হায়দার বাকী, এএসআই আলীমুল জাহিদ মুন্সি ও এএসআই মো. শাকিল আহাম্মেদের নেতৃত্বে পুলিশ দল আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন পয়েন্টের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ শুরু করে।
সিসিটিভি ও প্রযুক্তির সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে গাড়িটির অবস্থান। এরপর তাৎক্ষণিক অভিযানে বন্দর থানার নিমতলা বিশ্বরোড এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় কাভার্ডভ্যানটি উদ্ধার করা হয়। তবে গাড়ি পাওয়া গেলেও পণ্য ও অপরাধীরা ছিল অধরা।
কাভার্ডভ্যান উদ্ধারের পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একটি দল ছুটে যায় রাজধানী ঢাকায়। মতিঝিল থানার দক্ষিণ কমলাপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় গাড়ির হেলপার নয়নকে।
নয়নকে জিজ্ঞাসাবাদে মেলে চক্রের অন্য সদস্যদের হদিস। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে আটক করা হয় মহিউদ্দিন ও ইসমাইল ওরফে মুসলমান নামের দুই অভিযুক্তকে।
আটককৃতদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ জানতে পারে আত্মসাৎকৃত কাগজগুলো বায়েজিদ বোস্তামী থানার শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকার একটি প্যাকেজিং কারখানায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে আত্মসাৎ হওয়া পুরো ২১ রোল সাইজিং লাইনার পেপার উদ্ধার করে।
এ সময় চোরাই মাল রাখা ও কেনাবেচার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে জানে আলম, কামাল হোসেন ও রফিক উদ্দিন নামের আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কর্ণফুলী থানার ওসি মো. ইখতিয়ারউদ্দিন জানান, মাত্র ৩৬ ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে আত্মসাৎ হওয়া পুরো মালামাল ও কাভার্ডভ্যানটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া ৬ আসামির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং এই চক্রের সাথে আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধীদের চতুর পরিকল্পনা যেভাবে প্রযুক্তির ব্যবহারে নসাৎ হলো, তা এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

