ফুটবল ম্যাচ নাকি কোনো থ্রিলার সিনেমার ক্লাইম্যাক্স? আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক হয়তো ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর নিজেদের এই প্রশ্নই করছিলেন।
৯০ মিনিটের নির্ধারিত সময় যখন শেষের দিকে, তখনো স্কোরবোর্ড বলছিল ১-১। কিন্তু যোগ করা সময়ে ফুটবল বিধাতা লিখে রেখেছিলেন অন্য এক চিত্রনাট্য।
ল্যাপটপে চোখ রাখা কোটি ফুটবলপ্রেমীকে স্তব্ধ করে দিয়ে শেষ মুহূর্তের জাদুতে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
আগামী রবিবার শিরোপার চূড়ান্ত লড়াইয়ে লিওনেল স্ক্যালোনির দল মুখোমুখি হবে স্পেনের।
অন্যদিকে, থমাস টুখেলের শিষ্যদের স্তব্ধ করে দিয়ে ১৯৬৬ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার ইংলিশ অপেক্ষাটা আরও দীর্ঘ হলো।
ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠের আবহ জানান দিচ্ছিল, এটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়-তার চেয়েও বেশি কিছু। মাঠের শরীরি ফুটবলের প্রদর্শনী দেখে মনে হচ্ছিল, ফকল্যান্ড যুদ্ধের ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ছায়া বুঝি নেমে এসেছে আটলান্টার সবুজ ঘাসে।
প্রথমার্ধেই দুই দল মিলে ফাউল করেছে ১৯টি! ফাউলের এই মহড়ার প্রথমার্ধে জালের দেখা পায়নি কোনো দলই।
বিরতি থেকে ফিরেই খোলস ছেড়ে বের হয় ইংল্যান্ড। ৫৫ মিনিটে একটি দুর্দান্ত দলীয় আক্রমণের মাধ্যমে ম্যাচের ডেডলক ভাঙেন অ্যান্থনি গর্ডন।
হ্যারি কেইন মাঝমাঠে নেমে মরগান রজার্সকে বল বাড়াতে গেলে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ একটি দুর্দান্ত অ্যাক্রোবেটিক ক্লিয়ারেন্সে তা প্রতিহত করেন।
তবে বিপদ কাটেনি আর্জেন্টিনার। ফিরতি বল কুড়িয়ে ডেকলান রাইস বাড়ান রজার্সের দিকে।
ইংলিশ উইঙ্গারের নিখুঁত ক্রসে বক্সে দারুণভাবে জায়গা করে নিয়ে এক ছোঁয়ায় এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন গর্ডন। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।
পিছিয়ে পড়ে গোল শোধে মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালায় আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু তাদের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড।
৬৯ মিনিটে লিওনেল মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে নিকোলাস গঞ্জালেসের হেড এবং ৭৬ মিনিটে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড পোস্টে লেগে ফেরার পর ফিরতি শট যেভাবে পিকফোর্ড ফিরিয়ে দিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল আজকের দিনটি ইংল্যান্ডেরই।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের যে কখনোই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া যায় না, তা প্রমাণিত হলো ৮৬ মিনিটে।
বক্সের বাইরে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে এনজো ফার্নান্দেজের একটি বুলেট গতির শট ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ ও পিকফোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়। ১-১ সমতায় ফেরে ম্যাচ।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ম্যাক অ্যালিস্টারের আরেকটি প্রচেষ্টা পোস্টে লেগে প্রতিহত হলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সুবাস পাচ্ছিল। কিন্তু যোগ করা সময়ে মঞ্চে আবির্ভূত হন ফুটবলের মহাদায়ক লিওনেল মেসি।
তার পা থেকে আসা একটি জাদুকরী ও নিখুঁত ক্রস দূরের পোস্টে খুঁজে নেয় বদলি ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্তিনেজকে। ঠাণ্ডা মাথায় নিখুঁত হেডে বল জালে পাঠান লাউতারো।
পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়াম। আর রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই নিশ্চিত হয়ে যায় আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।
টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন থেকে এখন আর মাত্র এক ধাপ দূরে লিওনেল মেসিরা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

