চাকরির আশ্বাসে আটকে রেখে পর্ন ভিডিও তৈরি: স্বামী-স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার ৫

৯৯৯-এ এক তরুণীর ফোনেই ফাঁস! উদ্ধার ৪

প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:৫১

চাকরির খোঁজে আসা অসহায় তরুণীদের চোখভরা স্বপ্ন আর সুন্দর ভবিষ্যতের আশ্বাস। তবে সেই স্বপ্নের পেছনে ওত পেতে ছিল ভয়ঙ্কর এক শিকারি দল।

বিউটি পার্লারে ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে ডেকে এনে আটকে রাখা হতো বহুতল ভবনের অন্ধকার ঘরে।

এরপর কেড়ে নেওয়া হতো মুঠোফোন, চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, আর জোরপূর্বক তৈরি করা হতো পর্নোগ্রাফিক ভিডিও।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বহু দিন ধরে গড়ে ওঠা এমনই এক ভয়ঙ্কর ও লোমহর্ষক পর্নোগ্রাফি সিন্ডিকেটের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর একটি সাহসী ফোনের মাধ্যমে।

বৃহস্পতিবার রাতে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভার কিসমত করিমপুর এলাকার রাবেয়া হাসপাতালের পাশের একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে পুলিশ উদ্ধার করেছে আটকে রাখা চার তরুণীকে।

একই সাথে ওই স্থান থেকে এই জঘন্য কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী চক্রের মূল হোতা, তার স্ত্রী, দুই ছেলে এবং অপর এক সহযোগীসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন চক্রের মূল হোতা মো. সালাউদ্দিন, তাঁর স্ত্রী পারভিন আক্তার, তাঁদের দুই ছেলে ফাহাদ হাসান ও আরাফাত ইয়াসিন এবং চক্রের সহযোগী আবদুর রহিম।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মূল বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় হলেও তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নোয়াখালীতে ভাড়া বাসা নিয়ে অত্যন্ত গোপনে এই অনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন।

যেভাবে উন্মোচিত হলো অন্ধকার জগৎ:

আটকে থাকা তরুণীদের মধ্যে এক সাহসী তরুণী কৌশলে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ ফোন করে তাঁর জিম্মি দশা এবং ওপর চলা নির্যাতনের কথা জানান।

ফোন পেয়ে বেগমগঞ্জ থানা-পুলিশ বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে রাবেয়া হাসপাতালের পাশের ওই ভবনে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে জিম্মি অবস্থায় থাকা চার তরুণীকে উদ্ধার করার পাশাপাশি পুরো সিন্ডিকেটকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ পর্নোগ্রাফিক ভিডিও ধারণের কাজে ব্যবহৃত আধুনিক ক্যামেরা, ৬টি বিভিন্ন মডেলের মুঠোফোন, নির্যাতনের কাজে ব্যবহৃত একটি চাবুক, দুটি ছুরি, কাঁচি এবং নগদ ১ লাখ ৯৮ হাজার টাকা জব্দ করে।

এজাহারের রোমহর্ষক বিবরণ:

উদ্ধার হওয়া এক তরুণী বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ থানায় পর্নোগ্রাফি ও মানবপাচার নিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছেন।

এজাহারে তিনি জানান, এক বান্ধবীর মাধ্যমে সালাউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বিউটি পার্লারে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গত ২ আগস্ট তাঁকে চৌমুহনীতে নিয়ে আসা হয়।

চৌমুহনী পৌঁছানোর পর পরই তাঁকে ওই ভবনের একটি কক্ষে আটকে রেখে মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং নির্যাতন চালিয়ে তাঁর মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দৃশ্য ধারণ ও পর্নোগ্রাফিক ভিডিও তৈরি করা হয়।

শুধু তা-ই নয়, ধারণকৃত এসব ভিডিও বিদেশি ও দেশীয় একটি বিশেষ অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে প্রচার করে মোটা অঙ্কের টাকা আয় করত চক্রটি।

কেউ তাদের কথামতো কাজ করতে না চাইলে কিংবা প্রতিবাদ করলে তাঁর ওপর চালানো হতো অমানবিক চাবুকাপেট ও শারীরিক নির্যাতন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুজ্জামান জানান, চক্রটি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সহজ-সরল তরুণীদের চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে চৌমুহনীতে নিয়ে আসত।

এরপর গোপন আস্তানায় আটকে রেখে তাঁদের জীবনকে নরকতুল্য করে পর্ন ভিডিও তৈরিতে বাধ্য করত। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা এ অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

শুক্রবার বিকেলে গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ আসামিকে নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে, শুনানি শেষে বিচারক তাঁদের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

উদ্ধার হওয়া তরুণীদের নিরাপদে হেফাজতে রেখে পরবর্তী আইনি ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি