খাতা কলমের মূল্যায়নে ফলাফল প্রকাশের পর দেখা মিলল এক অভাবনীয় ও হতাশাজনক চিত্র। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবারের মাধ্যমিক ও সমমান (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার এবং জিপিএ-৫-দুই সূচকে দেখা গেছে বড় ধরনের পতন।
গত বছরের সমীকরণকে উল্টে দিয়ে পাসের হার এক ধাক্কায় নেমে এসেছে ৫৯.৪৮ শতাংশে। মানবিক বিভাগের ভয়াবহ ফল এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে এখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মাঝে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা ও গুণন-ভাগ।
এক বছরের ব্যবধানে ১২.৫৯ শতাংশের বড় পতন
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই ধসের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭২.৭ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় ১২.৫৯ শতাংশ। গত কয়েক বছরের ফলাফলের ধারাবাহিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের এই নিম্নমুখী সূচক সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।
পরিসংখ্যানের আড়ালে মূল চিত্র
এ বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার টেবিলে নাম লিখিয়েছিল মোট ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের পর শেষ পর্যন্ত উত্তীর্ণ হতে পেরেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, প্রায় ৫২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এবারে জিপিএ চালচিত্র পেরোতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে ছেলেদের চেয়ে ফলাফলের লড়াইয়ে এবারও কিছুটা এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। তথ্য অনুযায়ী: ছাত্রীদের পাসের হার ৬০.৩%, ছাত্রদের পাসের হার ৫৮.৭৬%।
মানবিকে চরম বিপর্যয়, আশা জাগাল বিজ্ঞান
এবারের ফলাফলের সবচেয়ে বড় ও বিষাদময় বার্তা এসেছে মানবিক বিভাগ থেকে। মানবিকে পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮.৭৯ শতাংশে! অর্থাৎ, মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় বসা ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ জনই পাস করতে পারেনি।
অন্যদিকে, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬০.১২ শতাংশ। এই বিপর্যয়ের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে বিজ্ঞান বিভাগ, এই বিভাগে পাসের হার সন্তোষজনক-৮৪.৪১ শতাংশ।
কমেছে মেধাবীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি: জিপিএ-৫ এ বড় ধাক্কা
শুধু সাধারণ পাসের হারই নয়, সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ পাওয়ার দৌড়েও পিছিয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বোর্ড। এবার বোর্ডের অধীনে সর্বমোট ৯ হাজার ৩৯৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জনে সক্ষম হয়েছে। অথচ গত বছর এই শীর্ষ সাফল্য স্পর্শ করেছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন শিক্ষার্থী। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ২,৪৪৫ জন জিপিএ-৫ অর্জনকারী কমেছে।
একদিকে শতভাগ উল্লাস, অন্যদিকে শূন্যের হতাশা
বোর্ডের গড় ফলাফলের এই বিষাদময়তার মাঝেও কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার আলো বজায় ছিল। বোর্ডের অধীনে থাকা ২১টি বিদ্যালয় থেকে অংশ নেওয়া শতভাগ শিক্ষার্থীই পাস করার সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে চরম অন্ধকার-এমন ৮টি বিদ্যালয় রয়েছে, যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাসের মুখ দেখতে পায়নি!
প্রশ্নের মুখে শিক্ষার মান
ফল প্রকাশের পর থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনস্তত্ত্বে কাজ করছে মিশ্র অনুভূতি। যারা কৃতকার্য হয়েছে, তাদের ঘরে উল্লাস থাকলেও সার্বিক সূচক দেখে অধিকাংশ অভিভাবকই প্রকাশ করেছেন গভীর উদ্বেগ।
বিশেষ করে মানবিক বিভাগে এ ধরনের অস্বাভাবিক ধস এবং এক বছরেই পাসের হার ১২ শতাংশেরও বেশি কমে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
হঠাৎ ফলাফলের এই বড় পতন কি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের কঠোরতার কারণে, নাকি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যমুখী করায় গাফিলতি ছিল? শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং মানবিকে এই ধসের কারণ উদঘাটনে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

