জন্মনিবন্ধন করার অজুহাতে দেড় বছরের ছোট্ট সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে গতকাল সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন রাঙামাটি জেলা পুলিশ লাইনসের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমিনুল ইসলাম (৩২)।
কিন্তু সেই সাধারণ একটি কাজই যে একটি পরিবারের জন্য অন্তিম যাত্রার অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়তো স্বজনদের কল্পনাতীত ছিল।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বাজারের ‘রিলাক্স জোন’ নামের এক আবাসিক হোটেলের রুদ্ধদ্বার কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তার ঝুলন্ত লাশ।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে মরদেহটি যখন উদ্ধার করা হয় তখন একই ঘরের মেঝেতে মুমূর্ষু ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তার (২৭)। আর সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে বাকরুদ্ধ হয়ে এক রুমে ছিল তাঁদের দেড় বছর বয়সী ফুটফুটে সন্তানটি।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ছুটি কাটাতে কয়েক দিন আগে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জে শ্বশুরালয়ে আসেন রাঙামাটিতে কর্মরত এএসআই আমিনুল।
রবিবার সকালে বাচ্চার জন্মনিবন্ধনের কথা বলে স্ত্রী ও সন্তানকে সাথে নিয়ে বের হন তিনি। দুপুর আনুমানিক দুইটার দিকে বড়তাকিয়া বাজারের আবাসিক হোটেল ‘রিলাক্স জোনে’ ওঠেন তারা।
সোমবার সকাল পেরিয়ে গেলেও কক্ষের কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় সন্দেহ হয় হোটেল কর্তৃপক্ষের। বারবার ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তারা খবর দেন স্থানীয় থানায়।
পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই ভেসে ওঠে এক নারকীয় দৃশ্য। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে আমিনুলের প্রাণহীন দেহ, আর পাশেই রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছেন স্ত্রী তাহমিনা। উদ্ধার করে তাঁকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক মেহের নিগার ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, তাহমিনা আক্তারের মুখ, ঠোঁট ও জিব মারাত্মকভাবে ফোলা ছিল এবং মুখ একপাশে বাঁকানো ছিল। নাক দিয়ে অবিরাম রক্ত ঝরছিল।
গলায় কোনো কিছু দিয়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের সুস্পষ্ট দাগ পাওয়া গেছে। জ্ঞান থাকলেও তিনি চরম শারীরিক আঘাতের কারণে কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
কী ঘটেছিল রিলাক্স জোনের সেই বদ্ধ কক্ষে? নিছক কোনো পারিবারিক বিবাদ, নাকি আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো সত্য?
নিহত আমিনুলের বড় ভাই মো. আবুল হাসান জানান, মাত্র দুই বছর আগে বিয়ে হয়েছিল আমিনুল ও তাহমিনার। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তাঁদের মধ্যে তীব্র দাম্পত্য কলহ লেগেই ছিল। স্থানীয়ভাবে বহুবার সালিস- দরবার করেও তাঁদের সংসারে স্থায়ী শান্তি ফেরানো যায়নি।
মিরসরাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম জানান, আমিনুলের লাশ উদ্ধার করে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক আলামত ও পেছনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের তীব্র পারিবারিক কলহ থেকেই এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত।
তবে এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টা, তা পুরো তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

