রাতের আঁধার নামলেই আতঙ্ক ভর করছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। কোথাও বেলকনির দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হচ্ছে, কোথাও বা বাধা দিতে গিয়ে রক্তে ভাসছেন বৃদ্ধ বাবা।
গৃহস্থালির রক্তঝরা তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণাধীন শিল্পকারখানাতেও।
সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ডাকাতি ও চুরির ঘটনায় এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়েছে উপজেলার বিভিন্ন জনপদে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই প্রশ্ন-রাতের অন্ধকারে ঠিক কতটা সুরক্ষিত তাঁদের জীবন ও জীবিকা?
হিঙ্গুলীতে বৃদ্ধকে কুপিয়ে তছনছ প্রবাসীর স্বপ্ন
সর্বশেষ সোমবার দিবাগত রাতে হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী গ্রামের এক প্রবাসীর বাড়িতে নেমে আসে অন্ধকারের তাণ্ডব।
বাড়িটিতে পুরুষ সদস্য বলতে ছিলেন কেবল বৃদ্ধ নুরুল আলম। বাকি সবাই প্রবাসে। ১৫ থেকে ২০ জনের একদল সশস্ত্র ডাকাত দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পুরো পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে।
গলার স্বর শুনে ডাকাতদের স্থানীয় মনে হলেও তাদের হাতে থাকা অস্ত্র এবং আচরণ ছিল চরম নৃশংস।
সাহেলা আক্তার সুমি নামের এক সদস্যকে বেঁধে রেখে এবং সন্তানদের অস্ত্রের মুখে দাঁড় করিয়ে পুরো ঘরে চালানো হয় লুটপাট।
প্রায় সাড়ে ৫ ভরি স্বর্ণালংকার, আড়াই লাখ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিতে গেলে বৃদ্ধ নুরুল আলমকে নির্মমভাবে কুপিয়ে জখম করে ডাকাতেরা।
ভুক্তভোগী কোহিনুর বেগম জানান, ডাকাতদের কারো হাতে ছিল ধারালো ছুরি, কারো হাতে পিস্তল।
ঘটনার পর জোরারগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল হালিম জানান, পুলিশের একাধিক দল অপরাধীদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে।
এক নজরে মিরসরাইয়ের সাম্প্রতিক অপরাধ চিত্র
| স্থান ও তারিখ | ঘটনার বিবরণ | ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহত | পুলিশের আইনি পদক্ষেপ |
| পূর্ব হিঙ্গুলী (সোমাবার রাত) | প্রবাসীর বাড়িতে ১৫-২০ জনের সশস্ত্র ডাকাতি। | সাড়ে ৫ ভরি স্বর্ণ, ২৫০,০০০ টাকা, ২ টি মোবাইল। বৃদ্ধ নুরুল আলম আহত। | জোরারগঞ্জ থানার একাধিক টিমের অভিযান অব্যাহত। |
| খৈয়াছড়া (শনিবার রাত) | হাজি শফি আহমেদ মেস্ত্রী বাড়িতে পরিবারকে বেঁধে রেখে লুটপাট। | স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন। | পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, অভিযান চলমান। |
| অর্থনৈতিক অঞ্চল (রবিবার রাত) | অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লি.-এর নির্মাণাধীন কারখানায় হানা। | ২৫০ মিটার তার ও নিরাপত্তা প্রহরীদের ৩টি মোবাইল। | ৩২ ঘণ্টার অভিযানে ৭ জন গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধার। |
| মিঠানালা (বুধবার রাত) | ফাঁকা বসতঘরের তালা ভেঙে চুরি। | নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও বৈদ্যুতিক তার। | আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে; অভিযোগ সাপেক্ষে ব্যবস্থা। |
শিল্পাঞ্চলে স্বস্তি ও অস্বস্তির দোলাচল
আবাসিক এলাকার পাশাপাশি অপরাধীদের নজর এখন জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলেও। ৯ আগস্ট রাতে ‘অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর নির্মাণাধীন কারখানায় ১০-১৫ জনের ডাকাতদল হানা দিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের জিম্মি করে বৈদ্যুতিক তার ও মোবাইল লুটে নেয়।
তবে এই ঘটনায় জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। টানা ৩২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে হিঙ্গুলী, জোরারগঞ্জ ও করেরহাট এলাকার ৭ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন মেহেদী হাসান, সুজাউল হক, এমদাদুল হক, মো. সাখাওয়াত হোসেন, মো. ইউসুফ, মো. রাকিব এবং মিজান উদ্দিন।
উদ্ধার করা হয়েছে লুণ্ঠিত মালামালও। গ্রেপ্তারদের মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন জোরারগঞ্জ থানার ওসি।
অন্যদিকে, ১০ নম্বর মিঠানালা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে রুহুল আমিনের শহরের অবস্থানের সুযোগে ফাঁকা বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশ সেখানে মূলতঃ বৈদ্যুতিক তার চুরির আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ধারাবাহিক এসব অপরাধে মিরসরাইয়ের সাধারণ বাসিন্দা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী মহলে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।
রাতের বেলা আবাসিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদার করার পাশাপাশি এই সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলোকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলার জোর দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

