রায়হান সিকদার, লোহাগাড়া প্রতিনিধি : কিশোর ও যুবকদের ফুটবল উন্মাদনা আর মাদকমুক্ত সুস্থ জীবনের ঠিকানা যেখানে, হঠাৎ করেই সেখানে কালো ছায়া।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মনদুলারচর দেওয়াল টলি এলাকার ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠটি দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চলে আসা এই খেলার মাঠটি রক্ষায় এবার একজোট হয়েছেন স্থানীয় তরুণ ও যুবসমাজ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকে মনদুলারচর এলাকার তরুণরা একটি প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে এই মাঠে নিয়মিত ফুটবল খেলার সূচনা করে।
মূলত বনবিভাগের মালিকানাধীন এই জায়গায় একসময় বনবিভাগ নার্সারি করার পরিকল্পনা করেছিল।
তবে স্থানীয় কোমলমতি শিশুদের খেলাধুলার বিষয়টি বিবেচনা করে বনবিভাগ সদয় হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এবং পাশের একটি স্থানে নার্সারি স্থাপন করে। সেই থেকে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে মাঠটিতে প্রতিদিন খেলাধুলা করে আসছে স্থানীয় শিশু-কিশোর ও তরুণরা।
ঘটনার সূত্রপাত ১২ আগস্ট (বুধবার) সকালে। অভিযুক্ত শফি নামের এক ব্যক্তি কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে এসে মাঠটি তাঁর বাবার ক্রয়কৃত ও ভোগদখলীয় সম্পত্তি দাবি করে সীমানা আইল দিয়ে দখলের চেষ্টা চালান।
বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকার তরুণ ও যুবকরা। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে একজোট হয়ে দখলচেষ্টায় তীব্র বাধা প্রদান করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জালাল আহমদ আক্ষেপ করে বলেন, ২০১৮ সাল থেকে আমরা নিজেদের খরচে এই মাঠে টুর্নামেন্টের আয়োজন করছি। এটি বনবিভাগের জায়গা, তারা শিশুদের খেলাধুলার কথা ভেবেই নার্সারি সরায়। এখন শফি এসে অযৌক্তিক দাবি তুলে সরকারি মাঠ দখল করতে চাচ্ছে।
আরেক বাসিন্দা মোঃ এহেছান উল্লাহর মতে, এলাকাকে অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদক থেকে দূরে রাখতেই তারা এই মাঠটি আঁকড়ে ধরে আছেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আমরা ও আমাদের ছোট ভাইয়েরা এখানে খেলছি। মাঠটি দখলমুক্ত রাখতে আমরা উপজেলা প্রশাসন, থানা, বনবিভাগ ও স্থানীয় ইউপি সদস্যকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করেছি। আমরা সরকারি এই সম্পত্তি সুস্থ বিনোদনের স্থান হিসেবেই ফেরত চাই।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. শফি জমিটি বনবিভাগের বলে স্বীকার করলেও নিজস্ব দাবির সপক্ষে বলেন, জায়গাটি সরকারি বনবিভাগের তা সত্য।
তবে এখানে আমার বাবার ৫০ বছরের দখল স্বত্ব রয়েছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে এতদিন চাষ করা সম্ভব হয়নি, এখন উপযোগী হওয়ায় আমরা চাষের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বনবিভাগ যদি জমি চায় আমরা ফেরত দেব, কিন্তু এলাকার ছেলেরা হঠাৎ খেলার মাঠ দাবি করছে।
ঘটনা প্রসঙ্গে ডলুবিট অফিসের ডেপুটি রেঞ্জার বিভাষ কুমার মালাকার স্পষ্ট ভাষায় জানান, খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে বনবিভাগের কর্মী পাঠানো হয়েছে। এটি শতভাগ বনবিভাগের জায়গা এবং গত ৮ বছর ধরে এটি খেলার মাঠ হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে। এই সরকারি জমি কাউকে কোনো অবস্থাতেই দখল করতে দেওয়া হবে না। মাঠটি মাঠ হিসেবেই থাকবে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোঃ জানে আলম (জানু মেম্বার) জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে মাঠের ঐতিহ্য রক্ষা করা তাদের অগ্রাধিকার।
বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে উপজেলা প্রশাসন। লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বায়োজিদ-বিন-আখন্দ জানান, মাঠ দখলের চেষ্টা সংক্রান্ত খবর পাওয়ামাত্রই স্থানীয় ইউপি সদস্যকে মাঠ রক্ষায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খেলার মাঠ খেলাধুলার জন্যই থাকবে। সরকারি জমি বা খেলার মাঠ দখলের অপচেষ্টা চালালে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসন ও বনবিভাগের এমন কঠোর অবস্থানের পর এলাকা জুড়ে স্বস্তি ফিরলেও, মাঠটি পুরোপুরি সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে স্থানীয় সচেতন তরুণ সমাজ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

