চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) দরবারে আইনের রক্ষক নাকি বাণিজ্যের ভক্ষক?
সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও চসিকের ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বিতর্কিত সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিমকে ঢাকার বসুন্ধরা থেকে যে হাতকড়া পরিয়ে টেনে এনেছিলেন, সেই একই কর্মকর্তা ডিসি মো. আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এবার হাতকড়া খুলতে ২৭ লাখ টাকার ‘ফাঁদ’ পাতানোর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা এলাকা থেকে গ্রেফতারের পর সাবেক কাউন্সিলর জসিমের বিরুদ্ধে একে একে ২৭টি মামলা দেওয়া হয়।
দেড় বছর জেল খাটার পর একের পর এক ২৭টি মামলায় জামিন পেলেও কারাগারের ফটক থেকে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়া হয়নি জসিমের। তার আগেই শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানোর নিশ্চয়তা কিনে নেওয়ার নামে চলেছে এই স্পর্শকাতর রফা-দফা।
অভিযোগ উঠে, নতুন কোনো সাজানো মামলায় যেন আবার ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ না দেখানো হয়-তা নিশ্চিত করতেই মাঠে নামে একটি মধ্যস্থতাকারী চক্র।
জাতীয় দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে নগরজুড়ে এখন তোলপাড়। প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য বলছে লেনদেনের নেপথ্যে মূল রূপকার হিসেবে নাম এসেছে চট্টগ্রাম মহানগর যুব মহিলা লীগের সদস্য সোনিয়া আজাদের।
সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের আড়ালে শীর্ষ পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে সখ্য তৈরি করা সোনিয়া কৌশলে সিএমপির তৎকালিন উত্তর বিভাগের (বর্তমানে ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স) ডিসি আমিরুলকে ম্যানেজ করেন। সূত্র-যুগান্তর
এরপর ৫ আগস্টের পর কারাবন্দি হওয়া নিজের স্বামীকে জামিনে বের করেন এবং একই ফাঁদ পাতেন জসিমের পরিবারের সামনে।
গত ৮ জুলাই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল জসিমের। তার আগেই প্রথম দফায় নগদ ১২ লাখ টাকা ডিসি আমিরুলের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানা যায়। এ সময় জসিমের স্ত্রী তাসলিমা বেগম, ভাই আকবর হোসেন খোকন ও মধ্যস্থতাকারী সোনিয়া নিজে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয় ওই প্রতিবেদনে।
কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কোতোয়ালি থানার পুরোনো মামলায় পুনরায় শ্যোন অ্যারেস্ট ঠুকে দেওয়া হলে, শতভাগ নিশ্চিত মুক্তির দ্বিতীয় গল্প ফাঁদে হাতিয়ে নেওয়া হয় আরও ১৫ লাখ টাকা।
যুব মহিলা লীগ নেত্রী সোনিয়ার বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি আইনি ব্যবস্থার নগ্ন রূপকে যেন আরও উলঙ্গ করে দেয়। তিনি ওই গণমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এখন সবাই জানে, কে কীভাবে বের হচ্ছে। টাকা দেওয়াটা এখন নিয়ম হয়ে গেছে, আমরা এই নিয়মে পড়ে গেছি।
যদিও পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসনের ভয়ে ও মিডিয়ার প্রশ্নের মুখে তিনি পিছু হটে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। দাবি করেন, জসিমের ভাই খোকনের অতি-আগ্রাসী মনোভাবের কারণে বিষয়টি জটিল হয়েছে।
এসব বিষয় আরও পরিস্কার করতে চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে সোনিয়া আজাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যে পুলিশ কর্মকর্তার কথা বলা হয়েছে তার সাথে যোগাযোগ হয়নি। টাকা লেনদেন নিয়ে যে তথ্যগুলো উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তার কিছুই তিনি জানেন না। তিনি নিজেকে নির্দোশ বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে তার স্বামী আবু নাসের চৌধুরী আজাদের কাছে কারাগারে থাকাকালীন সাবেক কাউন্সিলর জসিমের সাথে কী কথা হয়েছিল এবং কারামুক্তির পর তার স্ত্রী সোনিয়া আজাদের সাথে জসিমের পরিবারের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পেছনে তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না? এমন প্রশ্নে তিনি বর্তমানে খুবই অসুস্থ, কথা বলার অবস্থায় নেই বলে জানান তার স্ত্রী সোনিয়া আজাদ।
অন্যদিকে ক্ষোভে ফেটে পড়ে জসিমের ভাই আকবর হোসেন খোকন। তিনি জাতীয় ওই দৈনিককে বলেন, ভাবি প্রথমে আমাকে কিছু বলেননি। পরে জানতে পারলাম সোনিয়া নামের এক নারী ভাইয়াকে বের করার চুক্তি করেছেন।
অথচ মুক্তির দিনই সীতাকুণ্ড ও কোতোয়ালি থানার দুই মামলায় আবার শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হলো। এই অন্যায়ের বিচার আল্লাহর আদালতেই হবে।
এ বিষয়টাও নিয়েও জসিমের ভাই আকবর হোসেন খোকনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথেই চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, টাকা লেনদেন হয়েছে। এসব টাকা হয়তো নিজেদের পকেটে ভরে প্রশাসনের সাথে দ্বন্ধ সৃষ্টি করে আমার ভাইকে এবং আমাদের পরিবারকে আরও বেকায়দায় ফেলেছেন সোনিয়া আজাদ। পুরো ঘটনার বিস্তারিত এবং ভিডিও ফুটেজের প্রমাণসহ শীঘ্রই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মুখোশ উন্মোচন করা হবে দাবি করেন খোকন।
অবশ্য অভিযুক্ত ডিসি মো. আমিরুল ইসলাম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে পুরো ঘটনা উড়িয়ে দিয়েছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার ভাষ্য, আমি নিজে জসিমকে ধরে চালান করেছি, তার জন্য টাকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তবে আমিরুল ইসলামের অতীত আমলনামা তার এই সাফাইকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। উত্তর বিভাগে যোগদানের পর থেকেই সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হওয়া, নারী শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছনা কিংবা জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধরের মতো একাধিক অপকর্মের ছায়া তার পিছু ছাড়েনি।
বিতর্কের মুখে গত ১৮ জুন তাকে ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স শাখায় বদলি করা হলেও তার প্রশাসনিক দাপটে এতটুকু ভাটা পড়েনি।
আগুনে ঘি ঢেলেছে সম্প্রতি ১৪ আগস্ট ‘MD Sarwar’ নামের এক ফেসবুক আইডি থেকে আসা নতুন এক বিস্ফোরক দাবি।
যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলায় শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের পরিবারকে বাঁচানো এবং প্রকৃত আসামিদের আড়াল করে চন্দনাইশের বিএনপি নেতা এম.এ. হাসেম রাজুর মাধ্যমে ডিসি আমিরুল একাই গুনে নিয়েছেন ৭০ লাখ টাকা!
সিসিটিভি ফুটেজ ও স্পষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও মূল ঘাতকদের ছেড়ে ২০-৩০ জন নিরীহ মানুষকে অজ্ঞাত আসামি করে তুলে আনার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হওয়া সেই পোস্টে তীব্র কটাক্ষ করে বলা হয়, একদিন বলেছিলাম আপনাকে, প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেয়। দেখলেন তো ধীরে ধীরে প্রকৃতি হিসেব নিতে শুরু করেছে!
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা জানতে অভিযুক্ত ডিসি মো. আমিরুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কথা না হলে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে বার্তা পাঠালেও দুদিন ধরে তার কোন মন্তব্য মেলেনি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
আইন যেখানে টাকার অঙ্কে বিক্রি হয়, সেখানে ন্যায়বিচারের স্তম্ভ ভেঙে পড়তে বাধ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক গায়ে চড়িয়ে এমন অপরাধের তদন্ত যদি কোনো নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি দ্বারা না হয়, তবে ক্ষমতার আড়ালে থাকা এসব সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ মানুষের অবশিষ্ট আস্থাও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

