চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানা ঘিরে একের পর এক অভিযোগ স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে না পাঠিয়ে ছেড়ে দেওয়া, মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা, ঘুষ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, তবু স্থানীয়দের মধ্যে থানার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বোয়ালখালী থানায় ঘুষ ও অনিয়ম অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু ওসি মাহফুজুর রহমান যোগদানের পর সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্তমানে থানায় সাধারণ সেবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ বাড়ছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে চলতি মাসে। সিআর মামলা ১৪৬/২৩-এর ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে ১১ জুন চরনদ্বীপ এলাকার বাসিন্দা মো. মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার চরনদ্বীপ এলাকার বাসিন্দা মৃত ছমিউদ্দিনের ছেলে মো. মুজিবকে সিআর মামলা ১৪৬/২৩ এর ফৌজদারী কার্যবিধির ৭৫ ধারায় আসামীকে গ্রেপ্তারের আদেশ প্রদান করেন ম্যাজিস্ট্রেট।
ওয়ারেন্টমুলে বাদীর স্বামীকে সাথে নিয়ে থানা পুলিশের একটি টিম অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে গ্রেপ্তার হয় মুজিব।
বাদীপক্ষের দাবি, তাদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে এস আই মৃন্ময় আসামীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়।
তবে কয়েক ঘন্টা না যেতেই ভুক্তভোগীর কাছে খবর আসে আসামিকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
এ খবরে ভুক্তভোগী পুনরায় থানার ওসির কাছে ছেড়ে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ওসির ভাষ্য ওয়ারেন্ট কপির ফটোকপি দিয়ে আসামি ধরা যায় না। মূল কপি আনতে হবে।
এর প্রতিউত্তরে ভুক্তভোগী ওসিকে প্রশ্ন করে ফটোকপি দিয়ে যদি আসামি ধরা না যায় তবে আপনারা কেন অভিযান চালিয়েছেন এবং কেন আসামি ধরে থানায় নিয়ে এসেছেন।
তবে ভুক্তভোগী দাবি করেছে ওসি লক্ষ টাকার বিনিময়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তারের পরও ছেড়ে দিয়েছেন। এ ঘটনায় বাদীপক্ষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, যাচাই-বাচাই করে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পৌছায়নি। ফলে আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, গ্রেফতারি পরোয়ানা থানায় পৌছায়নি, কিন্তু বাদী পেল কিভাবে? সে হোয়াটসঅ্যাপে একটি কপি পাঠিয়ে থানা পুলিশকে বিভ্রান্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন ওসি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়ারেন্টভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে উপস্থাপন না করে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ আইনে নেই। ফলে ঘটনাটি নিয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এদিকে জুলাই হত্যা মামলার অজ্ঞাত আসামি সংক্রান্ত বিষয়েও বিভিন্ন পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনায় পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় মাদক বিস্তারের পেছনেও প্রভাবশালী একটি চক্রের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
শুধু ওসিকে ঘিরেই নয়, থানার কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। তারই আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে থানার এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লার দাপটেও স্থানীয় ব্যবসায়ীমহল আতঙ্কের মধ্যে থাকে।
এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লা গত শুক্রবার (১২ জুন) দুপুর সোয়া ১টার দিকে পৌরসভা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুল ইসলামের খাজা এন্টারপ্রাইজ নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে দুই কর্মচারীকে মারধর করেছেন।
ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল ঘটনাটিকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ এসআই মো.মাসুদ আলম মোল্লা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে আমার দুই কর্মচারীকে অহেতুক চড় মারতে থাকে। তিনি বলেন, শনিবার জামায়াতসহ ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষ্যে বোয়ালখালীতে মাইকিং করা হচ্ছিলো। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছি’।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হলে পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
তবে বোয়ালখালী থানার দাপুটে ওসি ঘটনাটি ভুল বুঝাবুঝি উল্লেখ করে সমাধান করে দিয়েছেন বলে ধামাচাপা দিয়ে দেন।
প্রশ্ন উঠছে, অভিযোগের পর অভিযোগ সামনে এলেও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে কি না।
স্থানীয়দের মতে, তদন্তের ফলাফল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হলে থানার প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেও অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উদঘাটন জরুরি হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

