ফাইল চালাচালি আর আমলাতান্ত্রিক মন্থরতার আড়ালে কীভাবে একটি দেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও শত শত কোটি টাকা চোখের নিমেষে উধাও হয়ে যায়, তার এক ক্লাসিক উদাহরণ তৈরি হলো এবার।
দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিদেশে থাকা ২৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা) উদ্ধার করতে গিয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা।
আর সেই সুযোগে আইনি ফাঁক গলে অবরুদ্ধ সেই বিশাল অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে উড়ে চলে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ স্বর্গ সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই)।
দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচারের এই রোমহর্ষক ঘটনাটি যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্মোচিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশীয় কর আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে আরেকটি ‘খেলা’ খেলছিলেন এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।
একদিকে কর ফাঁকির অপরাধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাকে সমপরিমাণ অর্থাৎ ৩০৭ কোটি টাকা জরিমানা করেছে, অন্যদিকে তিনি জরিমানাকে পাশ কাটিয়ে ১৩৬ কোটি টাকা কর দিয়ে পুরো বিষয়টিকে এক ধোঁয়াশাপূর্ণ অঙ্কে নিয়ে ঠেকেছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, শওকত আলীর এই বহুমাত্রিক দাবার চালের শেষ অঙ্কটি আসলে কোথায়?
চার সপ্তাহের সময়সীমা ও আটটি ই-মেইলের রহস্য
লন্ডনের আর্থিক গোয়েন্দাদের তৎপরতায় যে অর্থটি প্রায় হাতের মুঠোয় চলে এসেছিল, সেটি হাতছাড়া হওয়ার গল্পটি কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা একটি অতীব গোপনীয় চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) জানায়, শওকত আলী চৌধুরীর ২৫ মিলিয়ন ডলার তারা চার সপ্তাহের জন্য অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করেছে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) এই অর্থ চূড়ান্তভাবে বাজেয়াপ্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য একটি অকাট্য আইনি প্রমাণ চেয়েছিল-অর্থটি যে কেবল বাংলাদেশের আইনেই নয়, যুক্তরাজ্যের আইনেও অবৈধ উপায়ে অর্জিত।
বিএফআইইউর নথি যা বলছে: চার সপ্তাহের চরম সংবেদনশীল সময়সীমার মধ্যে ঢাকা ও লন্ডনের মধ্যে দফায় দফায় আটটি ই-মেইল বিনিময় হয়।
কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশ পক্ষ এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ বা আইনি নথি উপস্থাপন করতে পারেনি, যা ব্রিটিশ আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পারে।
আইন অনুযায়ী চার সপ্তাহ পার হওয়ার ঠিক পরপরই অবরুদ্ধ অর্থ সচল হয়ে যায়। আর এই সুযোগটির জন্যই হয়তো অপেক্ষা করছিলেন ইস্টার্ন ব্যাংকের এই চেয়ারম্যান।
অবমুক্ত হওয়া মাত্রই তিনি সম্পূর্ণ অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে সরিয়ে নিয়ে যান সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিএফআইইউর এই ব্যর্থতা স্রেফ ‘অদক্ষতা’ নাকি এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য যোগসাজশ বা ‘কৌশলগত নীরবতা’ ছিল, তা এখন এক মস্ত বড় প্রশ্ন।
একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বপ্রণোদিত হয়ে অর্থ আটকে দেওয়ার পরও কেন বাংলাদেশ চার সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলো-এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
এনবিআরের জরিমানা টু শওকতের আংশিক আপস:
যুক্তরাজ্য থেকে টাকা ফেরত আনার রাষ্ট্রীয় চেষ্টা যখন ভেস্তে গেল, তখন অভ্যন্তরীণ আইনি ব্যবস্থা হিসেবে আসরে নামে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)।
গত ১৫ মার্চ এলটিইউ তৎকালীন ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ঘোষণা করে।
আয়কর আইনের ২১ ধারা প্রয়োগ করে এই ঐতিহাসিক জরিমানা করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে: কোনো করদাতার রিটার্নে অপ্রদর্শিত বিদেশি সম্পদের সন্ধান মিললে এবং তিনি যদি তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তবে সেই সম্পদের সমমূল্য অর্থ জরিমানা করা যাবে।
এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনা না গেলেও, শওকত আলীর দেশে থাকা সম্পদ থেকে এই জরিমানার টাকা আদায়ের একটি আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।
এখানেই শুরু হয় শওকত আলীর নতুন খেলা। গত মে মাসে তিনি এই অপ্রদর্শিত অর্থের বিপরীতে ১৩৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করে রাষ্ট্রের সঙ্গে এক ধরনের আপসের চেষ্টা করেন।
কিন্তু করের টাকা দিলেও এনবিআরের সিংহভাগ জরিমানার অর্থ তিনি এখনো পরিশোধ করেননি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, করের টাকা দিয়ে তিনি মূলত অপরাধের দায় আংশিক স্বীকার করে নিয়েছেন, কিন্তু জরিমানার বিশাল অঙ্ক এড়াতে ভেতরে ভেতরে আইনি বা রাজনৈতিক কোনো বড় চালের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আইনের কঠোর প্রয়োগ নাকি শুধুই কাগুজে তর্জন-গর্জন?
আয়কর আইনে পরিষ্কার বলা আছে, করদাতা জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে কর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা রয়েছে তার দেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি বা বাজেয়াপ্ত করে সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার।
এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব গণমাধ্যমকে বলেছেন, “অর্থ উদ্ধারে সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।”
বিএফআইইউও দাবি করেছে যে শওকত আলীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান এবং তদন্ত শেষে অর্থপাচার আইনে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শওকত আলী চৌধুরী একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও একটি শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান।
এই জরিমানা এবং তদন্তের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও আর্থিক খাতে গভীর সংশয় রয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ পাচারকৃত অর্থ এবং অনাদায়ী জরিমানা কি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার দাপটে ফাইলবন্দি হয়ে যাবে, নাকি রাষ্ট্র সত্যি সত্যিই তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে?
এ বিষয়ে শওকত আলী চৌধুরীর কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তার এই রহস্যময় নীরবতা একদিকে যেমন তার অপরাধের দিকে আঙুল তুলছে, অন্যদিকে তা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ওপর অবিলম্বে কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্তের চাপ সৃষ্টি করছে।
দেশের আর্থিক খাতকে যদি সত্যি সত্যিই লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা করতে হয়, তবে শওকত আলীর এই ‘পাচার ও জরিমানার খেলা’র একটি চূড়ান্ত ও দৃষ্টান্তমূলক নিষ্পত্তি হওয়া এখন সময়ের দাবি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিএফআইইউ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সম্মিলিত ও আপসহীন পদক্ষেপই কেবল পারে এই ভীতিপ্রদ অর্থপাচারের গল্পের যবনিকাপাত টানতে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


