চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা লালদীঘির পাড়। জেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখাটি বহুকাল ধরেই শত শত সাধারণ আমানতকারীর আস্থার প্রতীক।
তবে সেই সুরক্ষিত ও ভারী লোহালক্কড়ের ক্যাশ ভোল্টের পেছনে যে দীর্ঘ এক বছর ধরে এক অভিনব ও অবিশ্বাস্য জালিয়াতির মহোৎসব চলেছে, তা কেবল ব্যাংকটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়নি, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণকে এক লহমায় উলঙ্গ করে দিয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তা ও বহিরাগত ব্যক্তির যোগসাজশে ক্যাশ ভোল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা উধাও হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ব্যাংকিং পরিভাষায় “নগদ অর্থের ঘাটতি” বলে চালানোর চেষ্টা হলেও, বাস্তবে এটি সাধারণ মানুষের রক্তঘামে অর্জিত আমানতের ওপর এক সুপরিকল্পিত ও দুঃসাহসিক থাবা।
১ হাজার টাকার নোটে ১০০ টাকার ভাঁজ: ভোল্টের চাবি কার হাতে?
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জালিয়াতি ও প্রতারণার কৌশলটি ছিল অত্যন্ত চতুর ও ঠান্ডা মাথার। ভোল্টে সুরক্ষিত রাখার জন্য যখন নগদ অর্থের বান্ডিল সাজানো হতো, তখন প্রতি হাজার টাকার নোটের বান্ডিলের ভেতরের অংশে ১০০ টাকা কিংবা তারচেয়েও কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে রাখা হতো।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো প্রতিটি বান্ডিলই লাখ টাকার কড়কড়ে নতুনের মতো সাজানো, কিন্তু ভেতরে লুকানো ছিল সস্তা কাগজের ভাঁজ!
এ ঘটনায় অগ্রণী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা (মামলা নম্বর: ২২/৪৩৮) দায়ের করেছেন।
এজাহারে ব্যাংকের ক্যাশ ইনচার্জ ও সিনিয়র অফিসার মো. কামরুল হোসেন (৪১) এবং তার সহযোগী বহিরাগত মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫) কে আসামি করা হয়েছে।
তবে এই অভিনব প্রতারণার ধরণ উদঘাটনের পর ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে সবচেয়ে বড় ও ভীতিকর প্রশ্নটি-ভোল্টের চাবি আসলে কার কার নিয়ন্ত্রণে ছিল?
একটি তফসিলি ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ভোল্ট খোলার জন্য ‘ডাবল কি’ বা যৌথ চাবি ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। ক্যাশ ইনচার্জের পাশাপাশি শাখা প্রধান কিংবা মনোনীত দ্বিতীয় কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ছাড়া ভোল্টের দরজা খোলা বা বন্ধ করা আইনত অসম্ভব।
একই সঙ্গে দিন শেষে ভোল্টে গচ্ছিত পুরো অর্থের দৈনন্দিন রেজিস্টার মেলানো এবং ফিজিক্যাল কাউন্টিং বা দৈহিক গণনা সম্পাদন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে শাখা ব্যবস্থাপনার ওপর।
যদি এজাহারের দাবিমতে ২০২৫ সালের ১ জুন চলতি বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত-দীর্ঘ ১৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে এই জালিয়াতি অবলীলায় চলতে পারে, তবে প্রতিদিনের সেই বাধ্যতামূলক ভোল্ট চেকিং কীভাবে সম্পন্ন হলো?
শাখা ব্যবস্থাপক কি প্রতিদিন চোখ বন্ধ করে সই করেছেন, নাকি জালিয়াতির এই জাল কেবল একজন ক্যাশ ইনচার্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়?
অভ্যন্তরীণ অডিট টিম যখন বছরজুড়ে শাখা পরিদর্শনে এসেছে, তখন তাদের চোখেও কি কেবল বাইরের মোড়কটিই পড়েছিল?
সাধারণ মানুষের আমানত এখন খামারের পুঁজিতে!
ব্যাংকের গচ্ছিত কোটি কোটি টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার পরিণতি ছড়িয়ে পড়েছে শত কিলোমিটার দূরে, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ব্যাংকের ভোল্ট থেকে কৌশলে বের করে নেওয়া ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার একটি বিশাল অংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে ‘ইশরাত এগ্রো’ নামক এক সুবিশাল গরুর খামারে।
যেখানে সাধারণ ব্যবসায়ী কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে মাত্র কয়েক লাখ টাকা ঋণের জন্য বছরের পর বছর ফাইল হাতে দ্বারে দ্বারে ঘোরেন, সেখানে কোনো প্রকার ব্যাংক হিসাব, ঋণের আবেদন বা আইনি নথি ছাড়াই ব্যাংকের সুরক্ষিত ভোল্টের সাড়ে চার কোটি টাকা রূপ নিয়েছে আধুনিক খামারের লাল-কালো ফিজিয়ান গরুতে!
বর্তমানে ওই খামারে ৫০ থেকে ৬০টি উন্নত জাতের গরু শোভা পাচ্ছে-যার পরোক্ষ অর্থ হলো, খেটে খাওয়া মানুষের ব্যাংক আমানত আজ গোয়ালঘরের মাংসে রূপান্তরিত হয়েছে।
তবে মামলার দ্বিতীয় আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরের পরিবারের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার বাবা আজিম উল্লাহ্ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সাজানো নাটকের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি জানান, তার ছেলে ব্যাংকের কর্মকর্তা বা গ্রাহক কোনোটিই নন, তিনি আগে থেকেই গবাদিপশুর স্বাধীন ব্যবসা করে আসছেন। কামরুল হোসেন তাকে লোভনীয় লাভের কথা বলে ব্যক্তিগতভাবে টাকা দিতেন এবং পরবর্তীতে মুনাফাসহ তুলে নিতেন।
গত ৯ আগস্ট রাত ১টার দিকে ব্যাংক থেকে ফোন করে তানভীরকে আটকে রাখার খবর দেওয়ার পর গভীর রাতে তারা পুলিশ সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকে প্রবেশ করেন।
তানভীরের পরিবারের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে তানভীরকে কৌশলে ডেকে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল এবং জোড়জবরদস্তি করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়েছে। ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা তার ছেলেকে দেওয়ার কোনো ব্যাংক নথি বা স্থানান্তরের ডিজিটাল প্রমাণ দিতে পারেনি ব্যাংক।
কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তাদের কাছ থেকে ‘অনার ৬০০ প্রো’ ও ‘আইফোন ১৬ প্রো’ মোবাইল ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগের তথ্য সংবলিত ৬৪ জিবি’র একটি পেনড্রাইভ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
নেপথ্যে কি কেবল দুজন, নাকি বিশাল বড় কোনো সিন্ডিকেট?
ব্যাংকিং আইন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আনোয়ার হোসেনের মতে, একজন বহিরাগত লোক সরাসরি ভোল্ট থেকে কোটি কোটি টাকা বের করে নিয়ে যাবে-এমন ঘটনা যেকোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রশাসনিক পরিকাঠামোর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি, দৈনিক ভোল্ট রেজিস্টার, মাসিক ও বাৎসরিক অডিট রিপোর্ট এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তদারকি এড়িয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে এই মাত্রার চুরি চালোনো একজন সাধারণ ক্যাশ ইনচার্জের পক্ষে এককভাবে করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ফলে জনমনে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্দরে যে সংশয় ঘনীভূত হচ্ছে তা হলো-ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন কি তবে কোনো বড় সিন্ডিকেটের কেবল একটি দৃশ্যমান ঘুঁটি মাত্র?
ঘটনাটি ধরা পড়ার পর তাড়াহুড়ো করে সমস্ত দায়ভার একজন কর্মকর্তা ও একজন বহিরাগত খামারির ওপর চাপিয়ে দিয়ে বড় কোনো চক্র নিজেদের আড়াল করতে চাইছে না তো?
একজন বহিরাগত লোক ব্যাংকের ভেতরে কীভাবে প্রবেশাধিকার পেলেন এবং কেন ডিজিটাল লেনদেনের পরিবর্তে নগদ টাকার এই ভেল্কিবাজি এতদিন চাপা পড়ে রইল, তার নিবিড় ও নিরপেক্ষ অডিট প্রয়োজন।
কেবল কোতোয়ালী থানার চিরাচরিত তদন্ত নয়, পুরো ঘটনার শিকড় উপড়ে ফেলতে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI) বা অপরাধ তদন্ত বিভাগে (CID) হস্তান্তরের জোরালো দাবি উঠেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভোল্ট যদি সাধারণ আমানতকারীদের জন্য এভাবে অনিরাপদ ও ফাঁপা হয়ে পড়ে, তবে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা ধসে পড়তে বাধ্য।
লালদীঘি শাখার এই ভোল্ট কেলেঙ্কারির প্রকৃত সত্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীদের আতঙ্কের প্রহর শেষ হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

