বাঁশখালীতে ছেলের লাঠির আঘাতে বাবার মর্মান্তিক মৃত্যু, দেশ ছাড়ার আগেই পুলিশে ধরা

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:১৬

পারিবারিক অমত, পছন্দ করে বিয়ে করা এবং ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ-এসব বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হওয়া সামান্য বাগ্‌বিতণ্ডাই ডেকে আনল এক বিষাদময় ট্র্যাজেডি।

নিজের পেটের সন্তানের লাঠির আঘাতে প্রাণ হারাতে হলো এক হতভাগ্য বাবাকে। নিহত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ শাহজাহান (৫০)।

ঘটনার পর ঘাতক ছেলে দেশ ছেড়ে ওমানে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কোকদণ্ডী নিদা গাজী পাড়া এলাকায়।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রের বিবরণ থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত বোরহান উদ্দিন শওকত পেশায় একজন ওমানপ্রবাসী। সম্প্রতি তিনি ছুটিতে বাড়ি আসেন এবং পরিবারের অমতেই বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে পারিবারিক ভিটায় ওঠেন।

এই বিয়ে মেনে না নেওয়া এবং বাড়ির জন্য নেওয়া ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয় নিয়ে সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে বাবা মোহাম্মদ শাহজাহান ও ছেলে শওকতের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

একপর্যায়ে ঝগড়া ছড়িয়ে পড়ে পরিবারের নারী সদস্যদের মধ্যেও। উদ্ভূত উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করতে বাবা শাহজাহান নিজের মেয়েকে বোঝাতে গিয়ে একটি চড়-থাপ্পড় মারেন। কিন্তু অসাবধানতাবশত সেই আঘাতের একপর্যায়ে প্রভাব পড়ে নতুন আসা পুত্রবধূর গায়ে।

এটি দেখেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ছেলে শওকত। তিনি মুহূর্তের মধ্যে একটি শক্ত লাঠি দিয়ে বাবার মাথায় সজোরে আঘাত করে বসেন।

মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন বাবা শাহজাহান। উপস্থিত স্বজনরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান।

অবস্থার অবনতি হলে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় জীবনের সাথে লড়াই করে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এদিকে বাবার মৃত্যুর পরপরই ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে আত্মগোপনে চলে যান বোরহান উদ্দিন শওকত। নিহতের বোন লাকী আক্তার বাদী হয়ে শওকত ও তার বোন রুবি আক্তারকে আসামি করে বাঁশখালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলা হওয়ার পর থেকে শওকত দ্রুত দেশ ছাড়ার ছক আঁকেন এবং বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে ঢাকা থেকে ওমানগামী ফ্লাইটে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশি তৎপরতা ও গোপন সংবাদের কাছে হার মানতে হয় তাকে।

বাঁশখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আরিফ হোসেন জানান, গোপন সূত্রে আমরা জানতে পারি শওকত বিমানবন্দর দিয়ে ওমানে পালানোর চেষ্টা করছে। তাৎক্ষণিকভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশকে সতর্ক করা হলে তাদের সহযোগিতায় ঘাতককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান বলেন, অভিযুক্ত শওকত প্রবাসী। ছুটি কাটাতে এসে সে পারিবারিক কলহের জেরে নিজ বাবাকে হারিয়ে দিল। সে আবারও বিদেশে পালানোর চেষ্টা করছিল, তবে আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় বিমানবন্দর থেকে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

আসামিকে চট্টগ্রাম নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হবে।

এদিকে মঙ্গলবার বিকেলে নিদা গাজী পাড়া এলাকায় নিজ পারিবারিক কবরস্থানে নিহত মোহাম্মদ শাহজাহানের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম শোক ও ক্ষোভের আবহ সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি